রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বা মহার্ঘ ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সোমবার রাজ্য বিধানসভায় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ডিএ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন তিনিই। জানান, রাজ্যে ডিএ-র পরিমাণ অতিরিক্ত ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে। বর্তমানে সরকারি কর্মীরা ১৮ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা পান। অর্থাৎ, ডিএ-র পরিমাণ বেড়ে হল ৩৮ শতাংশ। ১ অক্টোবর থেকে এই বর্ধিত ডিএ কার্যকর হবে।
ডিএ ২০ শতাংশ বাড়লেও এখনও তা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সমান হয়নি। কেন্দ্রের কর্মীরা ৬০ শতাংশ হারে ডিএ পান। আগে কেন্দ্রের ডিএ-র পরিমাণ ছিল ৫৮ শতাংশ। তা সম্প্রতি দুই শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ৬০ শতাংশ হারে ডিএ দেওয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মীদের ডিএ-র সঙ্গে কেন্দ্রের ফারাক এখনও ২২ শতাংশ। উল্লেখ্য, আগামী জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকার ফের এক দফা ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্ধিত ডিএ কার্যকর হওয়ার আগেই রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের ডিএ-ফারাক আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন:
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ডিএ বৃদ্ধির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘‘পুজোর মাসের মধ্যেই বাড়তি ২০ শতাংশ ডিএ আমরা দিয়ে দেব। বাকিটাও হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। আর একটা বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ডিসেম্বরের মধ্যে পে কমিশন কার্যকর করে দেব।’’
তৃণমূল সরকারের আমলে ডিএ নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় হারে ডিএ-র দাবিতে এবং পুরনো বকেয়া মহার্ঘ ভাতার দাবিতে দীর্ঘ দিন আন্দোলন করেছেন কর্মচারীদের একাংশ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী বাজেটে ডিএ সামান্য বাড়িয়েছিল তৃণমূল সরকার। চার শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ডিএ বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছিল। তা এপ্রিল মাস থেকে কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। তবে বর্ধিত হার কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ডিএ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। রাজ্য সরকারের আর্থিক অবস্থার কথা জানিয়ে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়ার দাবি বার বার এড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই সংক্রান্ত মামলাও চলছে আদালতে। ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেটেই সরকারি কর্মীদের ডিএ-ক্ষোভ কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করল বিজেপি সরকার। এ ছাড়া, বকেয়া ডিএ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে।
বাজেট নথিতে স্বপন বলেছেন, ‘‘রাজ্যের সরকারি কর্মচারী, আধা-সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও অশিক্ষকবৃন্দ সরকারের কাজ ও নীতি রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এঁদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দিতে আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, বর্তমানের ১৮ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার উপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, মোট মহার্ঘ ভাতার হার হবে ৩৮ শতাংশ। পেনশন প্রাপকেরাও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ ডিয়ারনেস রিলিফ পাবেন। এই মহার্ঘ ভাতা বা ডিয়ারনেস রিলিফ বৃদ্ধি ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে।’’
ডিএ বৃদ্ধিতে সরকারি কর্মচারীরা খুশি। বিজেপির সরকারি কর্মচারী পরিষদের সভাপতি দেবাশিস শীল বলেন, ‘‘আমাদের ডিএ ১৮ থেকে ৩৮ শতাংশ করা হল। যদিও বলা হচ্ছে, অক্টোবর থেকে এটা কার্যকর হবে। তবে আমার মনে হয়, একলাফে ২০ শতাংশ বর্ধিত ডিএ তিন-চার মাস পরে পেতেও সরকারি কর্মচারীদের আপত্তি থাকবে না। এটা নজিরবিহীন বৃদ্ধি। বাজেটের এই প্রস্তাবকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। আশা করছি, বিপুল আর্থিক বোঝা মাথায় রেখেও এই সরকার ধীরে ধীরে রাজ্য বাজেটের পরিমাণ কেন্দ্রের সমান করে দিতে পারবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আগের সরকার বছরে এক বার চার শতাংশ, তিন শতাংশ করে ডিএ বাড়িয়ে আমাদের ভিক্ষা দিত। সেখানে এটা দেওয়া হচ্ছে তিন মাস পরে, তবে এক বারে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে। আমরা এটাকে ইতিবাচক দিক বলেই মনে করছি।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘সরকার বাজেট ঘোষণার সময় ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি করেছে। এটা মন্দের ভাল। কারণ, আগের সরকার যে ভয়ঙ্কর বঞ্চনা করেছিল, তা কোনও সরকারের পক্ষে একসঙ্গে মেটানো সম্ভব ছিল না। আমরা মোটের উপর সন্তুষ্ট। তবে এটা জুলাই থেকে কার্যকর হলে ভাল হত। সরকারের কাছে আবেদন করব, বাকি ২২ শতাংশ ডিএ যেন ডিসেম্বরের মধ্যেই মিটিয়ে দেওয়া হয়।’’
কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিশ্বজিত গুপ্ত চৌধুরী বলেন, ‘‘২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে এটা অল ইন্ডিয়া কনজ়িউমার প্রাইস ইনডেক্স (এআইসিপিআই) অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে। এই রাজ্য সরকার বিরোধী দল থাকাকালীন বার বার বলেছিল, এআইসিপিআই অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা ন্যায্য পাওনা। ২০ শতাংশ কিন্তু অক্টোবর থেকে কার্যকর হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে পে কমিশন কার্যকর হবে। এটা অক্টোবর থেকে হলে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা ডিসেম্বরের মধ্যে দিয়ে পে কমিশন কার্যকর করার বাস্তবতা আছে কি? সেটা প্রশ্ন থেকে যায়।’’
আরও ঘোষণা
- রাজ্য পরিবহণ কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, এবং এজেন্সি মারফত নিযুক্ত ড্রাইভার, কন্ডাক্টরদের পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। তাঁদের পারিশ্রমিক বেড়ে হবে মাসিক ১৬ হাজার টাকা।
- সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ, গ্রিন পুলিশকর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক দু’হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। হোম গার্ড ও এনভিএফ কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিকও দু’হাজার টাকা বাড়বে। পুলিশ প্রশাসনকে সাহায্য করার জন্য অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে এই বৃদ্ধি, জানিয়েছে সরকার।
- গ্রামীণ এলাকায় পশুচিকিৎসা পরিষেবা দেন যাঁরা, সেই প্রাণীবন্ধু, প্রাণীসেবী, মৈত্রী ও অন্যান্য এআই কর্মীদের পারিশ্রমিকও মাসিক দু’হাজার টাকা বৃদ্ধি করছে সরকার।