সুইৎজ়ারল্যান্ডে আমেরিকা এবং ইরানের প্রথম দফার আলোচনা সমাপ্ত হয়েছে। একাধিক বিষয়ে একমত হয়েছে উভয়পক্ষ। সোমবার সকালে বিবৃতি দিয়ে তেমনটাই জানাল পাকিস্তান এবং কাতার। তাদের যৌথ বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে কাতারের বিদেশ মন্ত্রক।
ইরান ও আমেরিকার শান্তিবৈঠকে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে প্রথম থেকেই ছিলেন কাতার এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সোমবার তাঁরা যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছেন, যুযুধান দুই পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছোনোর জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছে। সেই অনুযায়ী আলোচনা চলবে সারা সপ্তাহ ধরে। তবে প্রাথমিক ভাবে প্রথম দফার আলোচনা শেষ। সোমবার শান্তিবৈঠক নিয়ে মুখ খুলেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও। সমাজমাধ্যমে তিনি দাবি করেছেন, সুইৎজ়ারল্যান্ডের বৈঠক থেকে ইরানের একাধিক প্রাপ্তিলাভ হয়েছে। তবে আমেরিকার তরফে বৈঠক শেষ হওয়ার বিষয়ে এখনও কেউ কোনও মন্তব্য করেননি। সুইৎজ়ারল্যান্ডে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স।
আরও পড়ুন:
কাতার-পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতি এবং আরাঘচির বক্তব্য থেকে মূলত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসছে—
উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছোনোর লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতিতে সম্মত হয়েছে ইরান ও আমেরিকা। ওই কর্মপদ্ধতি মেনে কাজ হবে। একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এই প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করবে। এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত আলোচনা সুইস রিসর্টেই চলবে সারা সপ্তাহ ধরে। প্রযুক্তি-আলোচনার দলকে রাজনৈতিক নির্দেশ দেবে নির্দিষ্ট কমিটি।
লেবানন প্রসঙ্গ
লেবাননে সংঘাতের অবসানের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। এ ক্ষেত্রে তৈরি করা হবে একটি ‘সংঘাত-নিরসন সেল’ বা ‘ডিএস্কেলেশন সেল’। এতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ এবং লেবাননের প্রতিনিধিও থাকবেন। নতুন করে যাতে পশ্চিম এশিয়ার দেশটিতে সংঘাতের পরিস্থিতি না তৈরি হয়, নতুন করে যাতে সেখানে কোনও সামরিক অভিযান না হয়, তা নিশ্চিত করবে এই সেল।
যোগাযোগের ‘চ্যানেল’
হরমুজ় প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা কমবে। বিবৃতি অনুসারে, হরমুজ় দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজগুলি যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই সরাসরি যোগাযোগের ‘চ্যানেল’ খোলা হচ্ছে। চূড়ান্ত সমঝোতার ৬০ দিন পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চালু থাকবে।
আরও পড়ুন:
ইরানের লাভ
আরাঘচি জানিয়েছেন, প্রথম দফার আলোচনা থেকে ইরানের বেশ কিছু লাভ হয়েছে। তাঁর দাবি, হরমুজ় প্রণালী থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার নিশ্চয়তা মিলেছে। তিনি বলেন, ‘‘তেল ও পেট্রোরসায়ন পণ্যের উপর আরোপিত বাণিজ্যিক বিধিনিষেধে ছাড় পেয়েছে ইরান। বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কিছু সম্পদ ও তহবিল মুক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া, ইরানের জন্য পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন তাঁদের প্রতিনিধিদল।’’ তবে যৌথ বিবৃতিতে ইরানের সম্পদ মুক্তির বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
প্রযুক্তিগত আলোচনা
যে সমস্যাগুলির সমাধান এখনও হয়নি, তা নিয়ে আলোচনা চলবে কারিগরি পর্যায়ে। এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীরাও একমত হয়েছেন। এই আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কার্যকলাপের প্রসঙ্গ, মার্কিন বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, আমেরিকা-ইরানের আলোচনার শুরুতেই তাল কেটেছিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, লেবাননে ইরান যদি তাদের ‘বন্ধু’কে না সামলাতে পারে, তবে আবার আমেরিকা হামলা চালাবে। ইরানিদের আর নিজেদের দেশ বলে কিছু থাকবে না। ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভ উগরে দেন আরাঘচিরা। প্রতিবাদে তাঁরা বৈঠকের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁদের হাত মেলানোর কথা ছিল। একসঙ্গে একটি ফটোশুটের আয়োজনও করা হয়েছিল। তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।