আশির দশকে বামেদের তুমুল রমরমার মধ্যেও কংগ্রেসের সাহচর্যে বড় হয়ে উঠেছি। সেই সময়েই প্রথম প্রশান্ত নন্দীর নাম শুনেছিলাম। শুনেছিলাম, কী ভাবে বিরোধীদের হাত থেকে দলের কর্মীকে বাঁচাতে তাঁর উপরে শুয়ে থেকেছেন। এটাও শুনেছি, একবার ঠান্ডার রাতে বাড়ি ফেরার পথে রিকশা চালকের জ্বর শুনে নিজের দামি চাদর খুলে তাঁকে দিয়েছেন। রাজীব গাঁধীর মৃত্যু থেকে উদয় চক্রবর্তী খুন-শহরে তুলকলাম উত্তেজনা হলেও ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলেছেন। সে সময়ে কংগ্রেসের মিটিং-মিছিল, সবই ছিল প্রশান্তদাকে ঘিরে। হিলকার্ট রোডের ‘জগদীশ ভবনে’ কংগ্রেসের অফিসের সামনে বসে থাকতেন। পোষাকে সর্বদাই কেতাদুরস্ত থাকতেন। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। কোনও কোনও সময় নানা রঙের জহর কোট।
শিলিগুড়ি কলেজে ভর্তি হয়েই ছাত্র পরিষদে যোগ দিয়েছিলাম। তার পর থেকে জগদীশ ভবনের সঙ্গে চিরকালের হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। প্রশান্তদার গোষ্ঠীর লোক বলেও পরিচিত হয়ে গেলাম। ভোটের সময় কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কী বলতে হবে- কলেজ থেকে পুরভোট, প্রশান্তদা ছাড়া ভাবতেই পারিনি।
শারীরিক অসুস্থতার জন্য প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও আমার এবারের ভোটের প্রচারের শুরুর দিনই সভায় এসেছিলেন। সম্পর্কটা রাজনীতি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌঁছায়। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় পড়া থেকে যোগাযোগ তৈরি, বিভিন্ন রিপোর্ট দেখা-সবই শিক্ষকের মতো শিখিয়েছেন। সাহসও ছিল অসীম। সামনে থেকে সব সামলাতেন। আমার পাড়ায় সিপিএম-কংগ্রেস গোলমালের সময় অনেক রাতে তৎকালীন বাম মেয়রের বাড়ির সামনে গিয়ে তাকে ডেকে বাইরে এনে আলোচনা করে সমস্যা মেটাতে দেখেছি। সবাই সমীহও করত।
২০০৫ সালের পর থেকে ক্যানসার ‘দাদা’র শরীর কাবু করে দিচ্ছিল। তাও দমে থাকেনি। আমার সঙ্গে গাড়িতে গ্রামে গিয়েছেন। আমাদের রক্তদান শিবিরে এসেছেন। ক্যানসার হাসপাতালে ১৫ অগস্ট অনুষ্ঠান করেছেন। এই অবস্থাতেও আবার প্রবীণ এক কংগ্রেস নেতাকে আর্থিক সাহায্য করেছেন। ডানপন্থী রাজনীতিতে উনি শহরের অভিভাবক ছিলেন। গত শুক্রবার শেষবারের মত আমার গাড়িতে করেই বিমানবন্দরে যান। রবিবার টেলিফোনে বলেছিলেন, বিকল্প কোনও চিকিৎসার কথা ভাবতে হবে। কিন্তু সেই সুয়োগ মিলল না। চিরকালের মতো রাজনীতির একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারালাম।
কারণ, আমি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ওঁর বাড়িতে যেতাম। নানা পরামর্শ দিতেন। এই তো কদিন আগেই বলেছেন, একটা সময় অভিমানে দল থেকে সরে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। পরমুহূর্তেই আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘কংগ্রেসে থেকেই মরতে চাই রে’। প্রশান্তদার সেই কথাটা এখনও কানে ভাসছে।
(লেখক জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং শিলিগুড়ি পুরসভার ৩ নম্বর বরো চেয়ারম্যান)