বন্ধ হয়ে গেল হিলির তিওড়ের ধীরেন মহন্ত শিশু নিকেতন নামে এনজিও পরিচালিত হোমটি। সোমবার প্রশাসনের তরফে হোমের অবশিষ্ট ৩৫ জন আবাসিক বালিকা ও কিশোরীকে অভিভাবকের হাতে তুলে দিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হল। রবিবার প্রথম দফায় ৫১ জন কিশোরী ও বালিকাকে হোম থেকে তাদের বাবা মায়ের হাতে তুলে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
এদিন হিলি ব্লকের বিজেপি নেতা কমল দে এবং জয়ন্ত প্রামাণিকের নেতৃত্বে কয়েকজন দলীয় কর্মী হোমের সামনে বিক্ষোভ দেখান। তাঁরা অভিযোগ করেন, এই ভাবে হোম বন্ধ করে দিয়ে অসহায় ও দুঃস্থ বালিকাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ফেলে দেওয়ার কোনও অধিকার নেই প্রশাসনের। হোম চালু রেখে যৌননিগ্রহের ঘটনার তদন্ত করতে হবে বলে বিক্ষোভকারীরা দাবি জানাতে থাকলে তড়িঘড়ি কমব্যাট ফোর্স নামিয়ে তাদের হটিয়ে দেওয়া হয়। তবে এদিন একাংশ আবাসিক কিশোরীর বলেছে, তাদের লেখাপড়া চালানোর মতো সামর্থ তাদের পরিবারে নেই। অনেকের বাবা ও মা ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজে রয়েছেন। বাড়িতে নিজের বলতে কারও রয়েছেন বৃদ্ধ ঠাকুমা, কারও দিনমজুর মা এবং প্রতিবন্ধী বাবা।
জেলাশাসক তাপস চৌধুরী বলেছেন, হোমের আবাসিক মেয়েদের এলাকার স্কুলে ভর্তি হতে কোনও সমস্যা হবে না। বিডিও এবং স্কুল সংসদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্কুলে নির্দেশ পঠানো হয়েছে। তবে নবম ও দশম শ্রেণির ওই হোমের আবাসিক কিশোরীদের অনেকেরই প্রশ্ন, ‘‘এলাকার কোনও স্কুল আমাদের ভর্তি নিলেও আমাদের প্রতি স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার স্বাভাবিক থাকবে, নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবেন? আমাদের আর লেখাপড়া হবে না।’’
আবাসিকদের মেয়েদের মতো গরিব অভিভাবকদেরও ওই সম্ভাবনার কথা ভাবিয়ে তুলেছে। এক মহিলা বলেন, ‘‘আমার স্বামী নেই। দুই বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করি। কী করে মেয়ের পড়াশোনা চালাবো ভেবে পাচ্ছি না।’’ হোম ছেড়ে যাওয়া অসহায় বালিকা ও কিশোরীদের প্রশ্নের উত্তর উপস্থিত ব্লক এবং প্রশাসনের কর্তারা দিতে পারেননি। এদিনও সিডব্লিউসি কমিটির কর্তাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ।
গত সোমবার হোমের কর্ণধার দিলীপ মহন্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক বালিকা ও কিশোরীদের যৌন নিগ্রহের অভিযোগ সামনে আসে। পুলিশ এখনও মূল অভিযুক্ত দিলীপকে ধরতে না পারায় বিরোধী কংগ্রেস ও বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্যোগ চলছে। ইতিমধ্যে দিলীপকে ধরতে পুলিশের একটি দল দিল্লিতে যায়। কিন্তু তাদের খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। জেলা পুলিশ সুপার শীশরাম ঝাঝারিয়া বলেন, ‘‘অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে তাকে ধরতে তল্লাশি চলছে।’’
এদিকে হোমের সমস্ত আবাসিককে বাড়িতে পাঠিয়ে হোমটি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে অভিযোগ করেছেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা আইনজীবী নীলাঞ্জন রায়। তাঁর অভিযোগ, ‘‘এ ক্ষেত্রে জুভেনাইল জাস্টিস আইনের (জেজেঅ্যাক্ট) তোয়াক্কা না করে দায়িত্ব এড়াতে প্রশাসন হোমটি বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু হোমের দুঃস্থ পরিবারের মেয়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা একবারও ভাবা হল না।’’
হোমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপার ভক্তি সরকার লাহা মনে করেন, ‘‘কিছুদিন হোমটি চালিয়ে পরে মেয়েদের ফেরত পাঠানের জন্য বলেছিলাম। আবেদন কেউ গ্রাহ্যই করলেন না।’’
এদিন বেলা ১২টা থেকে তিওড়ের ওই হোম থেকে বাকি আবাসিকদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতেই বালিকারা কাঁদতে থাকে। হরিরামপুর, তপন এবং মালদহের বামনগোলা এলাকার বাসিন্দা হোমের আবাসিকদের সরকারিভাবে তাদের অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ব্লক প্রশাসনের ভাড়া করা গাড়িতে চেপে বাবা মায়ের সঙ্গে আবাসিকেরা একে একে পাকাপাকি ভাবে হোম ছেড়ে চলে যেতে থাকেন। চোখের সামনে হোমটি বন্ধ হতে দেখে এদিন ভক্তিদেবী কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিকেল পাঁচটার মধ্যে হোমটি পুরো ফাঁকা হয়ে যায়।