Advertisement
E-Paper

দাম নেই, বন্ধের মুখে প্রতিমা নির্মাণ

বছরের ছ’মাস ওঁদের কেউ সব্জির ব্যবসা করেন, আবার কেউ ফেরিওয়ালার কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ওঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মাছের ব্যবসা ও রাজমিস্ত্রির কাজও করেন।

গৌর আচার্য

শেষ আপডেট: ৩১ অগস্ট ২০১৫ ০১:৩৩
জোর কদমে চলছে প্রতিমা তৈরির প্রস্তুতি। —নিজস্ব চিত্র।

জোর কদমে চলছে প্রতিমা তৈরির প্রস্তুতি। —নিজস্ব চিত্র।

বছরের ছ’মাস ওঁদের কেউ সব্জির ব্যবসা করেন, আবার কেউ ফেরিওয়ালার কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ওঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মাছের ব্যবসা ও রাজমিস্ত্রির কাজও করেন। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগের ছ’মাস অতিরিক্ত আয়ের আশায় তাঁদের প্রতিমা তৈরি করাই এত দিন রেওয়াজ ছিল। তবে উপকরণের দাম ধারাবাহিক ভাবে বাড়তে থাকলেও উদ্যোক্তারা প্রতিমার দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় গত দু’বছর ধরে রায়গঞ্জের কাঞ্চনপল্লি ও সুভাষগঞ্জ এলাকার কুমোরটুলির দেড়শো জনেরও বেশি মৃৎশিল্পী প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বর্তমানে তাঁরা কেউই চান না তাঁদের উত্তরসূরিরা প্রতিমা তৈরির কাজ করুক।

কাঞ্চনপল্লি এলাকার প্রবীণ মৃৎশিল্পী ভানু পাল বলেন, ‘‘নিজেদের পেশা ছেড়ে পুজোর আগের ছয়মাস দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে গত দু’বছরে কাঞ্চনপল্লি ও সুভাষগঞ্জ এলাকার দেড়শো জনেরও বেশি মৃৎশিল্পী প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যে সমস্ত শিল্পী এখনও প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা কেউই চান না তাঁদের উত্তরসূরিরা বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরির কাজ করুক।’’

রায়গঞ্জের কাঞ্চনপল্লি ও সুভাষগঞ্জ এলাকার কুমোরটুলিতে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৩০০ জন মৃৎশিল্পী বছরের ছ’মাস সব্জি ও মাছের ব্যবসা সহ ফেরিওয়ালা ও রাজমিস্ত্রীর কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দুর্গাপুজোর আগে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তারা অতিরিক্ত আয়ের আশায় সেই সব পেশা ছেড়ে বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরির কাজ করতেন। টানা লোকসানের মুখে পড়ে বর্তমানে তাঁদের মধ্যে দেড়শো জন মৃৎশিল্পীই প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। মৃৎশিল্পীরা জানিয়েছেন, ২০১২ ও ২০১৩ সালে প্রতিমা তৈরির উপকরণ মাটি, খড়, কাঠ, সাজসজ্জা, সুতলি, বাঁশ ও রঙের দাম গড়ে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এক ট্রাক্টর মাটির দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা। এক পণ খড়ের দাম ১২০ টাকা, কুইন্ট্যাল প্রতি কাঠের দাম ১৩০০ টাকা। এ ছাড়াও প্রতিমার সাজজজ্জার দাম বেড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হয়েছে। পাশাপাশি, কেজি প্রতি সুতলি ও রঙের দাম বেড়ে ১০০ ও এক হাজার টাকা হয়েছে।

Advertisement

কাঞ্চনপল্লি এলাকার মৃৎশিল্পী বাবু পাল ও সত্যেন পাল সব্জি ও মাছের ব্যবসা করেন। তাঁরা জানান, ২০১২ সাল পর্যন্ত তাঁরা নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ব্যবসা করার পর দুর্গাপুজোর আগে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বংশপরম্পরায় অতিরিক্ত আয়ের আশায় প্রতিমা তৈরির কাজ করতেন। তাঁদের দাবি, ‘‘২০১৩ সালেও আমরা প্রতিমা তৈরির কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু ওই বছর উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় হিসেব করে দেখি ১০ ও ১২ ফুটের এক একটি দুর্গা প্রতিমার দাম ওই বছর ১২ থেকে ১৬ হাজার ও ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়।’’

ওই দামে প্রতিমা বিক্রি হলে তাঁরা ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা করে লাভ করতে পারবেন। এক জন মৃৎশিল্পী শ্রমিকদের নিয়োগ করে ৮টির বেশি প্রতিমা তৈরি করতে পারেন না। তাঁদের কথায়, ‘‘পুজো উদ্যোক্তারা ওই বছর প্রতিমার বায়না দিয়ে এসে কেউ ১০ ফুটের প্রতিমার দাম ৮ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন, আবার কেউ ১২ ফুটের প্রতিমার দাম ১৫ হাজার টাকার বেশি দেবেন না বলে জানিয়ে যান। লোকসানের আশঙ্কায় তাই ওই বছর থেকে আমাদের মতো অনেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে দেন।’’

মৃৎশিল্পী অজয় পাল ও রিপন পাল ও বুবু পালের দাবি, ২০১০ সাল থেকেই ধারাবাহিক ভাবে প্রতিমার তৈরির উপকরণের দাম বাড়তে থাকে। মৃৎশিল্পীরা ওই বছর থেকেই প্রতিমার সঠিক দাম পাচ্ছিলেন না। বহু উদ্যোক্তা চাঁদা ওঠেনি বলে দাবি করে ৭০ শতাংশ দাম দিয়ে প্রতিমা নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে আর তাঁরা বাকি টাকা শোধ করেননি। তাঁদের কথায়, ‘‘বেশির ভাগ মৃৎশিল্পী টানা লোকসানে পড়ে প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy