গ্রেটার কোচবিহারের নেতা উপেন বর্মনের সঙ্গে একই সেলে যে বন্দি ছিল সে খুনের মামলায় ধৃত জেনে পুলিশকে নজর রাখতে অনুরোধ করেছিলেন ছেলে মুকুন্দ বর্মন। বৃহস্পতিবার উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে বাবার মৃতদেহ নিতে এসে এ কথাই জানিয়েছেন তিনি। বারবার অনুরোধ করার পরেও কেন পুলিশ সতর্ক হয়নি সেই প্রশ্নও ঘুরে ফিরে উঠছে তাঁর মনে।
এ দিন মুকুন্দবাবু জানান, সপ্তাহখানেক আগেই উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে বাবাকে দেখে গিয়েছিলেন তিনি। তখন ভালই ছিলেন। চিকিৎসকও বলেছিলেন উপেনবাবু ভাল হয়ে উঠছেন। ছেলের কথায়, ‘‘সে সময় বাবাকে যে সেলে রাখা হয়েছিল সেখানে আরেক বন্দি ছিল। ওই ব্যক্তি খুনের মামলার আসামী জেনে ভয় হয়েছিল। বাবা সাধাসিধে মানুষ। ওই আসামীর হাবভাব আমার ভাল লাগেনি। বাবার ক্ষতি করে দিতে পারে বলে সন্দেহ হচ্ছিল। সে জন্য পুলিশকে নজর রাখতে অনুরোধও করেছিলাম। পারলে অন্য জায়গায় নিতে বলেছিলাম। কিন্তু পুলিশ কথা শোনেনি। নজরও রাখেনি। সব দেখে তো মনে হচ্ছে বাবাকে পরিকল্পনা করেই মেরে ফেলা হল।’’ পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা অবশ্য এ সব নিয়ে কোনও কিছু বলতে চাননি।
মঙ্গলবার বেলা পৌনে এগারোটা নাগাদ উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বন্দিদের সেলে অভিযুক্ত বন্দি নিখিল রায় স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে উপেনবাবুর মাথায় আঘাত করে তাঁকে মেরে ফেলে বলে অভিযোগ। গ্রেটারের আন্দোলনে রেল অবরোধে সামিল হয়েছিলেন উপেনবাবু। অভিযোগ, সে সময় পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁর হাত ভেঙে দেয়। রাজনৈতিক বন্দি হিসাবে হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পাঠালেও সামান্য নিরাপত্তাটুকু দেয়নি।
সপ্তাহখানেক আগে উপেনবাবুর ভাঙা ডান হাতে অস্ত্রোপচার হলে চিকিৎসকরা আলাদা জায়গায় তাঁকে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন পুলিশকে। কেন না মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বন্দিদের ওই সেল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল না। সেখানে থাকলে সংক্রমণের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু কর্মীর অভাবে অন্যত্র নিয়ে নজরদারির সমস্যা হবে জানিয়ে পুলিশ আলাদা জায়গায় রাখতে রাজি হয়নি। অথচ উপেনবাবুর মৃত্যুর পর এখন একলাফে নিরাপত্তা কর্মী চার জনের পরিবর্তে দ্বিগুণ বাড়িয়ে আট জন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এখন নিরাপত্তা বাড়াতে বাড়তি কর্মী দেওয়া গেলে তখন কেন দেওয়া যায়নি সেই প্রশ্ন তুলেছেন গ্রেটার কোচবিহারের নেতারাও।
অভিযুক্ত বন্দির বিরুদ্ধে পুলিশ খুনের অভিযোগ দায়ের করেছে। বুধবার বেলা ১ টা নাগাদ পুলিশ মাথাভাঙার বাড়িতে মুকুন্দবাবুদের কাছে উপেনবাবুর মৃত্যুর খবর পৌঁছে দেওয়া হয়। রাতেই গ্রেটারের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে পৌঁছন তাঁর ছেলে। এ দিন ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ পরিবারের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুকুন্দবাবুর আর্থিক পরিস্থিতি ভাল নয়। দুই বিঘা জমিতে চাষ করে, বিড়ি বেঁধে কোনও রকমে সংসার চলে তাঁর। এ দিন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে এসেছেন পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা ধার করে। পুলিশের তরফে মৃতদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
মুকুন্দবাবুর সঙ্গে এ দিন ছিলেন গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের চার জন। তাঁদের মধ্যে মাথাভাঙা-১ নম্বর ব্লকের সহ সম্পাদক রতনানন্দ বর্মন, গ্রেটারের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুধীর বর্মন, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা পরিমল বর্মন এবং শুকারু বর্মনেরা। সুধীরবাবু বলেন, ‘‘এভাবে উপেনবাবুর মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারাও আলোচনা করছেন। খুনের আসামীর সঙ্গে তাঁকে রাখা হয়েছিল তাতে বিপদ ঘটতে পারে বলে উপেনবাবুর ছেলে পুলিশকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। বিষয়টি আমরাও মেনে নিতে পারছি না। পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়েই এই ঘটনায় দায়ী। আমাদের তরফে মামলা করার কথাও ভাবা হয়েছে।’’ সেই মতো বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীর সঙ্গেও তাঁরা পরামর্শ করছেন বলে জানিয়েছেন।