ভোটার তালিকা তৈরি করলেই হবে না। সেটি যে ত্রুটিমুক্ত, আধিকারিকদের সেই শংসাপত্রও দিতে হবে। তার পরেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। এই বিধি স্মরণ করিয়ে সর্বস্তরের আধিকারিককে বার্তা দিল কমিশন। এ ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) থেকে জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) পর্যন্ত সবাই দায়বদ্ধ থাকবেন। প্রশাসনের খবর, কমিশনের তরফে চিঠি আকারে বার্তাটি পাঠিয়ে দেওয়াও হয়েছে জেলাশাসকদের। এ ক্ষেত্রে কোনও জেলার তালিকায় ত্রুটি থাকলে তার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক দায়বদ্ধ হবেন।
সব জেলায় শুনানির কাজ জোর কদমে চললেও ভোটারদের ‘ডিসপোজ়’ (যাচাইয়ের ভিত্তিতে ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত বা বাদ দেওয়া অর্থাৎ নিষ্পত্তি) করার কাজ কার্যত থমকে আছে। সুপ্রিম কোর্ট নথি দাখিলের জন্য ১০ দিন অতিরিক্ত সময় দিলেও শুনানির তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা একেবারে নগণ্য হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। কারণ, সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির কাজ ১০০ শতাংশ না-হলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। শেষ লগ্নের তাড়াহুড়োয় সব আবেদন একসঙ্গে নিষ্পত্তি করতে গেলে ত্রুটি থেকে যাওয়াও স্বাভাবিক।
এই পরিস্থিতির উল্লেখ করে চিঠিতে কমিশন জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে (ইসিআইনেট) ইআরও বা এইআরও-রা নথি আপলোড এবং ডিসপোজ় করলে জেলাশাসক, রোল-পর্যবেক্ষক, বিশেষ রোল-পর্যবেক্ষক এবং সিইও-র যাচাই করা বাধ্যতামূলক। দৈনিক যা শুনানি হচ্ছে, তা সফটওয়্যারে জানাতে হবে। ‘আন-ম্যাপড’ এবং তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি) আওতায় থাকা ভোটারদের শুনানির পরে দৈনিক সেই নথি আপলোড করতে হবে।
কমিশন বলেছে, এত দিন পর্যন্ত যত বকেয়া আছে, ২৬ জানুয়ারির মধ্যে তার নিষ্পত্তি করতে হবে। জেলাশাসকের কাছ থেকে নথি পুনর্যাচাই হয়ে ফিরে এলে ইআরও এবং এইআরও-কে সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে হবে। সে দিনই তা সফটওয়্যারে নথিবদ্ধ করতে হবে।
কমিশন সূত্রের বক্তব্য, সব শুনানি এবং নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পরে জেলাভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সম্পর্কে জেলাশাসককে শংসাপত্র দিয়ে জানাতে হবে যে, সেই তালিকা পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত এবং কমিশনের বিধি-নিয়ম মেনেই তা করা হয়েছে। প্রত্যেক জেলা থেকে তালিকা পাওয়ার পরে সিইও-কেও একই শংসাপত্র দিয়ে কমিশনের সদর দফতরে তা পাঠাতে হবে। কমিশনের অনুমোদন পেলেই তা প্রকাশিত হবে। প্রশাসনের একাংশের মতে, এ ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই আইনি দিক থেকেও কঠোর। তালিকা প্রকাশের পরে তাতে ভুলত্রুটি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জবাবদিহি করতে হবে। কমিশন কঠোর পদক্ষেপও করতে পারে। শংসাপত্র দিলে দায় অস্বীকার করার জায়গা থাকবে না।
কমিশনের এক কর্তার কথায়, “প্রতি বছর ভোটার তালিকায় যে সাধারণ সংশোধনের কাজ হয়, তাতেও এমন শংসাপত্র দেওয়ার রীতি রয়েছে। কিন্তু সেই তালিকার ত্রুটি খতিয়ে দেখা হত না। এসআইআর-এ কমিশন যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তাতে ত্রুটিবিচ্যুতি খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে মামলা হওয়ায় এবং শীর্ষ আদালতের কড়া নজর থাকায় পদক্ষেপগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
তবে এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। প্রতি বছর ভোটার তালিকা সংশোধনের পরেও কেন এসআইআর-এ এত ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? ২০০২ সালের এসআইআর-এর তালিকাতেও গুচ্ছগুচ্ছ ত্রুটির অভিযোগ। এ-ও প্রশ্ন ওঠে, বিগত বছরগুলিতে কমিশনের নজরদারি ছিল কি? ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরিতে কমিশন উদাসীন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত রাখতে প্রতি বছর কড়াকড়ি করলে মানুষের এই ভোগান্তি হত না। কমিশন ও প্রশাসনকে এত চাপ নিতে হত না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)