এ যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের কেরামতি!
ঝাড়গ্রাম প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্রের লাগোয়া আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটির ভোল বদলে গিয়েছে রাতারাতি। আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের আদিবাসী সংগ্রহশালা ও সেমিনার হলে অস্থায়ী ভাবে ১২ টি স্ট্যান্ড এসি মেশিন বসানো হয়েছে। সেগুলি চালানোর জন্য কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে পেল্লায় ডিজি জেনারেটর। মেঝেতে পাতা হয়েছে সবুজ কার্পেট। সেমিনার হলে নতুন কাঁচের দরজা বসেছে। পাতা হয়েছে চেয়ার-টেবিল। সংগ্রহশালার পুরনো উই-ধরা দরজাগুলি বদলে ফেলে লাগানো হয়েছে নতুন কাঠের দরজা। দরজায় ঝুলছে দামি নতুন পর্দা। প্রতিটি দর্শনীয় বিভাগের উপর শিরোনাম জ্বলজ্বল করছে। নামগুলি যে থার্মোকল কেটে লেখা হয়েছে তা অবশ্য শিল্পীর সূক্ষ্ম হাতের কাজের জেরে বোঝার উপায় নেই। চোখ ধাঁধানো পরিবেশে পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতির দর্শনীয় নানা সম্ভার। দেখলে মনে হবে, সংগ্রহশালাটি নিময়িত খোলা থাকে।
অথচ দিন তিনেক আগে পর্যন্তও তালাবন্ধ হয়ে পড়েছিল ঝাড়গ্রাম আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটি (ট্রাইব্যাল ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, সংক্ষপে টিআইসি)। গত ফেব্রুয়ারিতেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝাড়গ্রাম সফরের সময় আদিবাসী কেন্দ্রটি বন্ধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সফরের জেরে এবার গোটা টিআইসি চত্বরটি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সাজিয়ে তোলার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রশাসন। কারণ, আজ মঙ্গলবার বিকেলে আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের সেমিনার হলে মুখ্যমন্ত্রীর পৌরোহিত্যে পশ্চিমবঙ্গ উপজাতি পরামর্শদাতা পরিষদের প্রথম সভাটি হবে। থাকবেন ঝাড়গ্রামের সাংসদ উমা সরেন এবং জঙ্গলমহল তথা রাজ্যের কয়েকজন আদিবাসী বিধায়ক।
ঝাড়গ্রাম শহরের উপকন্ঠে বাঁদরভুলায় পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্রের পাশেই রয়েছে এই আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের ভবনটি। ভবনে রয়েছে আদিবাসী সংগ্রশালা ও একটি প্রস্তাবিত অডিও ভিস্যুয়াল সেমিনার হল। এছাড়া ভবনের চত্বরে একটি ওপেন থিয়েটরও রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঝাড়গ্রাম প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্রটির সঙ্গে আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের ভবনটিরও উদ্বোধন করেছিলেন। বাঁদরভুলায় শাল জঙ্গলের মধ্যে পুরো প্রকল্পটি তৈরি হয় পর্যটন দফতরের টাকায়। এলাকাটি বন দফতরের। তাই ভবন তৈরির কাজটি করেছিল বন দফতর। প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্রটি বন উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নিয়মিত এখানে পর্যটকরা থাকেন। পর্যটকদের কাছে আদিবাসী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্যই পাশেই আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের সংগ্রহশালাটি চালু করার জন্য বছর দু’য়েক আগে পর্যটন দফতর ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছিল। ওই টাকায় সংগ্রহশালার জন্য বেশ কিছু জিনিসপত্র কেনা হয়। এ ছাড়া বছর খানেক আগে ঝাড়গ্রাম মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সংগ্রহে থাকা বেশ কিছু প্রাচীন আদিবাসী সংস্কৃতির নির্দশন সংগ্রহশালাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তারপরও গত এক বছরেও আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের সংগ্রহশালাটি চালু করা যায়নি। সেমিনার হলটিও অসম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। প্রশাসন সূত্রের খবর, এই আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন ঝাড়গ্রামের মহকুমাশাসক। আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের ভবনটি পর্যটন দফতরের টাকায় বন দফতর তৈরি করেছে। ফলে বিভাগীয় জটিলতায় বীক্ষণ কেন্দ্রে এখনও স্থায়ী ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়নি। তাছাড়া বীক্ষণ কেন্দ্রটি চালানোর জন্য কোনও কর্মীও নেই।
আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী আসবেন বলে সাজসজ্জায় কোনও কোনও রকম খামতি রাখা হচ্ছে না। সোমবার গিয়ে দেখা গেল, একসঙ্গে অনেক মিস্ত্রি কাজ করছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনা আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে যান। ঝাড়গ্রামের মহকুমাশাসক নকুলচন্দ্র মাহাতো দীর্ঘক্ষণ সেখানে থেকে সাজজ্জার কাজ কেমন চলছে তা খতিয়ে দেখেন।
আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রের সংগ্রহশালায় রয়েছে বহু প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য নির্দশন। এতদিন সেটি বন্ধ থাকায় উৎসাহী পর্যটকরা হতাশ হয়ে ফিরে যেতেন। প্রশাসন সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার পরে আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটির জন্য ভাড়া করা এসি মেশিন, জেনারেটর-সহ সব বিভিন্ন জিনিসপত্রগুলিও ফেরত চলে যাবে। মুখ্যমন্ত্রীর সফরের পরেও কী চালু থাকবে আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রটি। সোমবার এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মহকুমাশাসক নকুলচন্দ্র মাহাতো জানান, আদিবাসী বীক্ষণ কেন্দ্রে খুব তাড়াতাড়ি স্থায়ী বাতানুকুল ব্যবস্থা করা হবে। কেন্দ্রটি নিয়মিত চালানোর জন্য প্রশাসনিকস্তরে পদক্ষেপ
করা হচ্ছে।