Advertisement
E-Paper

টালিগঞ্জের পর্দায় নতুন ‘অরূপ’! গাণ্ডীব হাতে তুলে নিয়ে পার্থ এখন দেখছেন ‘পাখির চোখ’, বদলে যাবে টলিউডের বিশ্বাস?

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজের পরিসরকে বড় করতে চাইছেন পার্থ। সেই লক্ষ্যেই দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করছেন। সংস্কৃতিমনস্ক বাম নেতাদেরও নিজের নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। যার ফলে ওই নেতাদের মনে ব্যক্তি পার্থের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯
(বাঁ দিক থেকে) অরূপ বিশ্বাস, পার্থ ভৌমিক এবং স্বরূপ বিশ্বাস।

(বাঁ দিক থেকে) অরূপ বিশ্বাস, পার্থ ভৌমিক এবং স্বরূপ বিশ্বাস। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

টলিউডের ‘বিশ্বাস’ কি পাল্টে যাচ্ছে?

গত দেড় দশক ধরে টলিউডের ‘নিয়ন্ত্রক’ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করেন ভাই স্বরূপ। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁরাই শেষকথা। তাঁরাই আইন। তাঁদের ঘিরেই বাংলা বিনোদন জগতের বিভিন্ন পর্যায়ের খ্যাতনামীদের আনাগোনা।

সেই সমীকরণ কি বদলে যাচ্ছে? টালিগঞ্জের আনাচেকানাচে এখন তেমনই জল্পনা। এবং সেই জল্পনা একেবারে কারণরহিত নয়। সেই কারণের নাম পার্থ ভৌমিক। যিনি এতদিন গোকুলে বাড়ছিলেন। ইদানীং প্রকাশিত হয়েছেন। তিনি অভিনয় করছেন, তারকাদের ঘরোয়া পার্টিতে যাচ্ছেন, ছবির প্রিমিয়ারে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন। এমন ধারাবাহিকতা দেখেই তৃণমূলের রাজনীতি এবং টলিউডের ঘাঁতঘোঁত সম্পর্কে ওয়াকিবহালেরা বলতে (এবং বুঝতে) শুরু করেছেন যে, নৈহাটির পার্থ টালিগঞ্জ পাড়ার নতুন ‘অরূপ বিশ্বাস’।

এমনিতে পার্থ বহুদিন ধরে নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মঞ্চের পার্থকে পর্দায় আনার কাজটি প্রথম করেছিলেন টালিগঞ্জের পরিচালক তথা ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী। ঘটনাচক্রে, নৈহাটির যে কলেজে পার্থের ছাত্র রাজনীতি শুরু, সেই কলেজে অশিক্ষক কর্মচারী ছিলেন রাজের বাবা। ফলে চেনা-পরিচিতি একটা ছিলই। রাজ সফল পরিচালক। তিনি অভিনেতা চিনতে ভুল করেননি। রাজের ‘আবার প্রলয়’ ওয়েবসিরিজ়ে পার্থ অভিনয় করেছিলেন পুলিশ আধিকারিকের চরিত্রে। তাঁর সংলাপ ‘হ্যালো স্যর’ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। প্রশংসিত হয়েছিল তাঁর অভিনয়। দর্শক তো বটেই, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিধানসভায় পার্থের অভিনয়ের অকুণ্ঠ প্রশ‌ংসা করেছিলেন।

তবে রসিকজনেরা বলছেন, রাজ ছাড়াও টলিউডে পার্থপ্রবেশের আরও দু’টি পথ আছে। এক, নৈহাটির বড়মা। দুই, বিরিয়ানি।

প্রথমটি সরাসরি অরূপের দুগ্গাপুজোর সঙ্গে পাল্লা টানছে। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময়ে অরূপের ক্লাব বলে খ্যাত সুরুচি সঙ্ঘে তারকাদের ভিড় নজর কাড়ে। স্বাভাবিক। একে রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী। দ্বিতীয়ত, টালিগঞ্জেই বিধায়ক। কে আর তাঁকে চটাতে চান! বিভিন্ন দায়ে-দফায় মন্ত্রীমশাই তো উপকারে আসেন। ফলে সুরুচি সঙ্ঘের পুজোয় ঢাক না বাজালে তারকাদের সেই ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির সমূহ সম্ভাবনা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পার্থ এনে হাজির করেছেন সমান্তরাল ভক্তিগীতি। নৈহাটির বড়মার মন্দির যে ভাবে প্রচারে এসেছে, তা ছুঁয়ে যেতে শুরু করেছে টলিউডকে। দেব-শুভশ্রী থেকে শুরু করে প্রসেনজিৎ (ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবারেই প্রসেনজিৎ যাচ্ছেন নৈহাটির মন্দিরে)— বহু তারকা, পরিচালক, প্রযোজক ছবির জন্য শুভকামনায় বড়মার মন্দিরে যাচ্ছেন। যে বড়মার মন্দিরের উপর তৃণমূলে সর্বোচ্চ নেত্রীর বাণীর অনুপ্রেরণায় লেখা রয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, বড়মা সবার’।

২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশিই আরও একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছিল। সে পরিবর্তন রসনায়। তৃণমূলে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঢালাও বিরিয়ানির বন্দোবস্ত শুরু হয়েছিল মমতা রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর। সিপিএম আমলের ‘ডিম্ভাত’কে গুনে গুনে পাঁচ গোল মেরেছে বিরিয়ানি। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিরিয়ানির দোকান খুলেছে এবং ফুলেফেঁপে উঠেছে। কলকাতা শহরে যদি তার অভিজ্ঞান হয় ‘আরসালান’, তা হলে উত্তর শহরতলিতে ‘দাদা-বৌদির বিরিয়ানি’। পার্থ টলিউডের বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ইদানীং আমন্ত্রিত থাকেন। যানও। কখনও-সখনও নিজে যেতে না পারলেও বিরিয়ানি পৌঁছে যায়।

পার্থের সঙ্গে আরও একটা তফাত তাঁর দলতুতো দাদার রয়েছে। যাকে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন তৃণমূলের এক নেতা, ‘‘অরূপ বিশ্বাস ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করলেও তিনি ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’। মাঠে নামেন না। অর্থাৎ, অভিনয় করেন না। কিন্তু পার্থ অভিনয়টা জানেন এবং পারেন। এটা তাঁর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা।’’ ওয়েবসিরিজ় তো বটেই, ব্রাত্য বসুর নাটকেও পার্থ অভিনয় করেছেন। তা ছাড়া, তাঁর সঙ্গে অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতে ‘স্বচ্ছন্দ’ বোধ করেন টলিউডের পরিচালকেরা। যেমন এক বিখ্যাত পরিচালক বলেছেন, ‘‘পার্থদার সঙ্গে অভিনয় নিয়ে কথা বললে একটা আরাম হয়। নিজে অভিনয় করার ফলে উনি ওই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বোঝেন। সমস্যা যেমন বোঝেন, তেমনই সমাধানও বোঝেন।’’

তবে এসব নেহাতই ‘সাইড শো’। মূল মঞ্চে যে অভিনয় হচ্ছে, সেখানে উইংসের দু’পাশে রয়েছে দু’টি ঠিকানা— কালীঘাট এবং ক্যামাক স্ট্রিট। অরূপ যে কালীঘাটের ‘আস্থাভাজন’, তা কে না জানে! আবার পার্থ যে ক্যামাক স্ট্রিটে ‘গুরুত্ব’ পান, তা-ও তৃণমূলের অন্দরে সহজপাঠ।

মমতার সরকারের ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় ছবি নির্মাণ করেছেন বিধায়ক-পরিচালক রাজ। দিন কয়েক আগে নন্দনে সেই ছবির প্রদর্শনে অভিষেকের পাশেই স্বমহিমায় বিরাজমান ছিলেন পার্থ। অভিষেকের ডানপাশের আসনে বসে তিনি গোটা ছবিটি দেখেন। একাধিক মন্ত্রী, রাজ্যসভা এবং লোকসভার বহু তৃণমূল সাংসদও নন্দনে হাজির ছিলেন। নজর কেড়েছে অরূপের অনুপস্থিতি। আনুষ্ঠানিক কারণ বলছে, মন্ত্রী সেদিন গঙ্গাসাগরে ছিলেন। ঠিকই। ফলে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে বটে। যেমন ফাঁকা থেকে গিয়েছিল মাঠ। যে মাঠে সেই ছবি দেখতে আসা তারকা এবং পরিচালকদের সঙ্গে বিভিন্ন ‘পাস’ দেওয়া-নেওয়া করেছেন পার্থ।

টলিউড এবং তৃণমূলের রাজনীতি সম্পর্কে যাঁরা উৎসাহী, তাঁদের দাবি, ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ একটি পাল্টা ‘ভরকেন্দ্র’ তৈরি হচ্ছে। পার্থের সঙ্গে খানিক আঠালো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে সেই তারকাদের, যাঁদের সঙ্গে বিশ্বাস ভ্রাতৃদ্বয়ের সম্পর্ক ‘মধুর’। তৃণমূলের থেকে দূরত্বকামীদের একাংশ পার্থের সঙ্গে সমন্বয় রাখছেন। অভিনেতা পার্থের সঙ্গে নেতা পার্থও মাঠে নেমেছেন। ওই তারকাদের তিনি নিয়ে আসছেন দলের কাছাকাছি। তাঁরা কি সরাসরি জোড়াফুলের পতাকা ধরবেন? হয়তো না। কিন্তু তাঁরা কৌশলে শাসকদলের উদ্দেশ্যই সাধিত করবেন। তবে পার্থ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজের পরিসরকে আরও বড় করছেন। দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করছেন। সংস্কৃতিমনস্ক বাম নেতাদেরও নিজের নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আবার আমন্ত্রণ রক্ষা করায় তাঁরা যাতে নিজেদের দলে অসুবিধায় না-পড়েন, তাই তাঁদের ছবির ফ্রেমের বাইরে রাখছেন। ফলে ওই নেতাদের মনে ব্যক্তি পার্থের উচ্চতাও খানিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। একান্ত আলোচনায় সেই বামনেতারা মাখো-মাখো গলায় বলছেন, ‘‘পার্থদার মধ্যে কিন্তু একটা অন্যরকম আন্তরিকতা রয়েছে।’’

টলিউডে বিশ্বাসদের ‘আধিপত্য’ ভাঙতে বিজেপি-ও নানাবিধ চেষ্টা করেছিল। তারা অভিযোগ এনেছিল চলচ্চিত্রশিল্পে ‘তৃণমূলীকরণের’। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে একগুচ্ছ তারকাকে দলে শামিল করিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। ভোটের ছবিতে তাঁরা ‘সুপারফ্লপ’ হয়েছেন এবং ভোটের পরে পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতো ঝরে গিয়েছেন। রাজনীতিকে পাকাপাকি বিদায় জানিয়েছেন তনুশ্রী চক্রবর্তী, পায়েল সরকার, যশ দাশগুপ্তেরা। বেহালা পশ্চিমে লড়াই করা শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়কে এখন প্রায় রোজই তৃণমূলের মঞ্চে দেখা যাচ্ছে। বরাহনগরে পদ্মপ্রতীকে গত বিধানসভা ভোটে লড়াই করা পার্নো মিত্র ‘ভুল সংশোধন’ করতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন (তৃণমূলশ্রুতি হল, পার্নো তাঁর ভুল সংশোধন করার বাসনাটি পার্থের কাছেই প্রথম ব্যক্ত করেছিলেন। তার পরে ঘটনা দ্রুত এগোয়। যদিও পার্নোর যোগদানের মঞ্চে পার্থ ছিলেন না। সেদিন তিনি দলীয় কাজে নন্দীগ্রামে)। টলিউডের প্রতিনিধি হিসাবে বিজেপি-তে টিমটিম করছেন রুদ্রনীল ঘোষ।

যুবভারতীতে মেসিকাণ্ডের পরে অরূপকে ক্রীড়া দফতর থেকে ‘অব্যাহতি’ নিতে হয়েছে। এমনিতেই খানিক মুষড়ে রয়েছেন তিনি। সঠিক সময়ে গাণ্ডীব হাতে তুলেছেন পার্থ। যদিও তিনি নিজে বলছেন, ‘‘ধুর-ধুর! এ সব নিয়ে আমার একফোঁটা আগ্রহ নেই! কোনও আগ্রহ নেই।’’

সেটা স্বাভাবিক। পার্থ বিলক্ষণ জানেন, টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর ভূমিকা এখনও কিছু অভিনেতা, পরিচালক এবং কিয়দংশের প্রযোজকের মধ্যে সীমিত। কিন্তু সিংহভাগ অভিনেতা থেকে প্রযোজনা সংস্থা, বহু পরিচালক এবং সর্বোপরি টেকনিশিয়ানদের ‘বিশ্বাস’ এখনও অরূপ-স্বরূপেই নিবেদিত।

গাণ্ডীব হাতে তুলে পার্থ আপাতত সেই ‘পাখির চোখ’ই দেখছেন।

Aroop Biswas Partha Bhowmick Swarup Biswas
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy