ভোটমুখী পশ্চিমবাংলায় রাজনৈতিক আখ্যান নির্মাণে দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। চলমান এসআইআর ইস্যু কার্যত চাপা পড়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ বিতর্কে। ৭২ ঘণ্টা কাটার আগেই সেই বিতর্ককে পিছনে ফেলে সামনে চলে এল রান্নার গ্যাস নিয়ে নাগরিক উদ্বেগ। এবং তাকে হাতিয়ার করে ভোটারদের হেঁশেলে ঢুকে পড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং।
বুধবার তিন দিক থেকে দ্রুত সক্রিয়তা দেখিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হন মমতা। এক, কেন্দ্রকে এই উদ্বেগ ছড়ানোর জন্য দায়ী করে সংবাদমাধ্যমে এবং সমাজমাধ্যমে একটার পর একটা বক্তব্য রেখে যাওয়া। দুই, রাজ্যের ‘সীমাবদ্ধ’ জায়গা থেকে রান্নার গ্যাস নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা ও বৈঠকের ঘোষণা। তিন, এ নিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে দেওয়া। সঙ্গে দলের বিভিন্ন স্তরের সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক পদাধিকারীদের দিয়ে সঙ্কটের পরিস্থিতির প্রচার শুরু করিয়ে দেওয়া।
আরও পড়ুন:
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলেই রান্নার গ্যাসের জোগানে সমস্যা তৈরি হয়েছে। যাকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গেরস্তালিতে। সেই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক এমন নয়। তবে এখনও তা সঙ্কটের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে এমনটাও বলা যায় না। তবে মমতার মতো অনেকেরই অভিমত, নাগরিকদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারেরও দায় রয়েছে। প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, ২১ দিনের আগে গ্যাস বুকিং করা যাবে না। তার পর তা বৃদ্ধি করে করা হয় ২৫ দিন। এই ঘোষণার কারণেই মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি হতে থাকে রান্নার গ্যাস নিয়ে।
কলকাতা, জেলা, মফস্সলে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার গুদামের বাইরে সাধারণ মানুষের ভিড় জমছে। ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুক করার ব্যবস্থাও ঠিক মতো কাজ করছে না। এই পরিস্থিতিতে ময়দানে নামলেন মমতা। বুধবার দুপুরে তিনি দু’টি টেলিভিশন চ্যানেলে ফোনে গ্যাস-উদ্বেগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নিশানা করেন কেন্দ্রীয় সরকারকেই। মমতা বলেন, ‘‘আমি তো ভর্তুকি দিতে চাই। তাতে লাভ হবে না। কারণ, গ্যাসের জোগানই নেই! গ্রামবাংলা থেকে শহর— সকলের এতে সমস্যা হচ্ছে। আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। বৃহস্পতিবারই বৈঠক ডেকেছি। একটা কিছু বিকল্প ভাবা দরকার। দেখছি কী করা যায়।’’
বুধবার নবান্নে একপ্রস্ত বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পর তিনি বলেন, ‘‘একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে, যেটা চিন্তার বিষয়।’’ গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের সমন্বয় তৈরি করার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। যাতে কত গ্যাস মজুত রয়েছে এবং কত সরবরাহ করা হল, তার হিসাব থাকে। রাজ্যের গ্যাস যাতে বাইরে না-যায়, তা-ও সুনিশ্চিত করার কথা বলেছেন মমতা।
প্রশাসনিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন এ হেন পদক্ষেপ করছেন, তখন তৃণমূলনেত্রী হিসাবে তিনি আগামী সোমবার কলকাতার রাস্তায় গ্যাস-উদ্বেগ নিয়ে মিছিলও করতে পারেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু মমতা নন, বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও মমতার পরে রান্নার গ্যাস নিয়ে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ মমতা শুরু করার পরে বাকি তৃণমূলও গ্যাস-উদ্বেগকে হাতিয়ার করে ময়দানে নেমে পড়েছে। মা ক্যান্টিন নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিমান এবং ফিরহাদ। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে ভক্তদের জন্য তৈরি ভোগ বিতরণেও রাশ টানা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে কলকাতার রেস্তরাঁগুলিতেও অনেক কিছু কাটছাঁট করা হচ্ছে। স্কুলগুলিতে মিড ডে মিলের রান্না কী ভাবে হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ জারি রয়েছে প্রশাসনে। যদিও মমতা বলেছেন, কোনও ভাবেই মিড ডে মিল বন্ধ করা যাবে না। হাসপাতাল এবং হস্টেলগুলোতে যেন নিয়মিত গ্যাস পৌঁছোয় এবং সাধারণ বাড়ির গ্রাহকদের যাতে কোনও সমস্যায় পড়তে না হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে নবান্নের তরফে। এই মর্মে জেলাশাসকদেরও নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য। কোথাও যাতে কালোবাজারি না-হয়, তা-ও পুলিশকে সতর্ক ভাবে নজরদারি করতে বলা হয়েছে।
এলপিজি গ্যাসের মাধ্যমে যে অটো চলে, সেখানেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। সিএনজি ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অনেক জায়গায় রান্নার গ্যাস ভরে অটো চালাচ্ছেন চালকেরা। বেশ কিছু জায়গা থেকে সিএনজি নিয়ে কালোবাজারিরও অভিযোগ উঠছে। কলকাতা ও শহরতলির বেশ কিছু রুটে আচমকা বেড়ে গিয়েছে অটোভাড়াও। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের সঙ্কট হবে না। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু কেন্দ্রের সেই ঘোষণায় যে উদ্বেগ কাটছে না, তা স্পষ্ট। এ হেন পরিস্থতিতে ভোটের আগে হেঁশেলে ঢুকে পড়তে চাইলেন মমতা। এক দিকে ‘দিদি’ হিসাবে তিনি জনতার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিলেন। অন্য দিকে প্রশাসক হিসাবে পদক্ষেপ করা শুরু করেছেন। নামতে পারেন রাস্তাতেও।