রান্নার গ্যাস এবং বাণিজ্যিক গ্যাস (এলপিজি)-এর জোগান নিয়ে উদ্বিগ্ন গ্রাহকেরা। তাঁদের বড় অংশের অভিযোগ, ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুকিং করতে পারছেন না তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে সিলিন্ডার বুকিং করতে না পেরে রাজ্যের নানা প্রান্তে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারগুলিতে ভিড় বাড়ছে। যে সমস্ত গ্রাহকের ই-কেওয়াইসি করা নেই, তাঁরাও গ্যাস পেতে সেন্টারগুলোর সামনে ভিড় বাড়াচ্ছেন।
গ্যাসের জোগান ব্যাহত হওয়ায় রাস্তার ধারের হোটেলগুলিতে কাঠ-কয়লার উনুনে রান্না করা শুরু হয়েছে। হোম সার্ভিস চালাতে একই পথে হাঁটছেন অনেকেই। বুধবার তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরের তরফে জানানো হয়েছে, আপাতত ভক্তদের জন্য প্রসাদ বিতরণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। আগামী ২১ মার্চের পর ওই মন্দিরে আর প্রসাদ মিলবে না। তবে গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে ফের প্রসাদ বিতরণ শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল চালু রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোথাও মিড ডে মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর নেই। তবে গ্যাসের জোগানে টান পড়লে স্কুলপড়ুয়াদের দুপুরের খাবারেও কোপ পড়তে পারে।
গ্যাস নির্ভরতা কাটাতে গ্রাহকদের অনেকেই বিকল্প উপায় খুঁজছেন। বিভিন্ন জেলার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকানগুলিতে ইনডাকশন অভেন কিনতে ভিড় জমাচ্ছেন তাঁরা। হুগলির ব্যান্ডেল এলাকার একটি দোকানের মালিক জানিয়েছেন, এমনিতে দিনে তিন-চারটি ইনডাকশন বিক্রি হত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন দিনে ৭০-৮০টা বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
শুধু এই রাজ্যে নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই গ্যাসের জোগান ব্যাহত হয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার বুক করতে গিয়েই হোঁচট খাচ্ছেন অনেকে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ফোনে বুকিং হচ্ছে না। অনেকে আবার বুক করার ৮ থেকে ১০ দিন পরেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। লাভ হচ্ছে না গ্যাসের দফতরে গিয়েও। এই পরিস্থিতিতে ট্রেনে রান্নার ক্ষেত্রেও গ্যাসের পরিবর্তে মাইক্রোওয়েভ কিংবা ইনডাকশন অভেন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে আইআরসিটিসি। আপাতত রেলের ‘ওয়েস্টার্ন জ়োন’কে এই পরামর্শ মেনে চলতে বলা হয়েছে।
গৃহস্থালির গ্যাস ছাড়াও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ায় বহু হোটেল এবং রেস্তরাঁর ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। কলকাতায় এখনও তেমন কিছু শোনা না গেলেও মুম্বইয়ে ২০ শতাংশ হোটেল-রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কোথাও মেনু কাটছাঁট করা হচ্ছে। মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছে সেখানকার হোটেল এবং রেস্তরাঁগুলির সংগঠন ‘আহার’। বেঙ্গালুরু, চেন্নাইয়ের মতো শহরেও গ্যাসের জোগানের অভাবে হোটেলগুলির পরিষেবা মার খেয়েছে। কলকাতা-সহ দেশের অনেক শহরেই গ্যাসে চলা অটো পরিষেবা চালু রয়েছে। সঙ্কটের কারণে কলকাতায় অটোর এলপিজি-র দাম লিটার প্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে কলকাতায় অটোর গ্যাসের নতুন দাম হয়েছে প্রতি লিটার ৬২.৬৮ টাকা, যা আগে ছিল ৫৭.৬৮ টাকা। এর ফলে বহু রুটেই অটোর ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরেই গোটা বিশ্বে তেল এবং গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ওমান এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ় প্রণালী ইরান কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখায় তেল এবং গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারগুলি সেখানগুলি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভারতে মোট আমদানি হওয়া অশোধিত তেলের ৪০ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ৮০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়া থেকেই আসে। এই পরিস্থিতিতে তেল এবং গ্যাসের জোগান নিয়ে অনিয়শ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি সূত্র মারফত একাধিক বার দাবি করা হয়েছে, দেশে যথেষ্ট পরিমাণ তেল এবং গ্যাস মজুত রয়েছে।
গ্যাসের জোগান নিয়ে আশ্বস্ত করলেও সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, ২৫ দিনের কম ব্যবধানে দু’টি গ্যাস সিলিন্ডার ‘বুক’ করতে পারবেন না গৃহস্থেরা। মন্ত্রক সূত্রে খবর, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেকেই ‘প্যানিক বুকিং’ করছেন। অর্থাৎ, অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত করার চেষ্টা করছেন। আপাতত গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত গ্যাসের জোগান সুনিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে কেন্দ্র। তবে বাণিজ্যিক গ্যাসের ক্ষেত্রে হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে জোগান সুনিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।