দেশব্যাপী গ্যাস সঙ্কটের প্রভাব এ বার পড়তে শুরু করল কলকাতার রেস্তরাঁগুলিতে। কোথাও বন্ধ হয়েছে পরোটা। কোথাও চাইনিজ় খাবার। কোথাও ভাবনাচিন্তা চলছে মাছের পাতুরি বন্ধ করার। কলকাতার কিছু রেস্তরাঁর হেঁশেলে গ্যাস প্রায় শেষ হতে বসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না-হলে আগামী কয়েক দিনে আরও বেশ কিছু রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের জেরে প্রায় ‘অবরুদ্ধ’ হয়ে রয়েছে হরমুজ় প্রণালী। বিভিন্ন দেশে ধাক্কা খেয়েছে জ্বালানির জোগান। ভারতও তার বিকল্প নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন জারি করেছে কেন্দ্র। তাতেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস সিলিন্ডারের পর্যাপ্ত জোগান না-থাকায় মুম্বই, বেঙ্গালুরু-সহ বিভিন্ন বড় শহরে একের পর এক রেস্তরাঁ বন্ধ হতে শুরু করেছে। একই পরিস্থিতি কলকাতাতেও।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রান্নার মেনুতে কাটছাঁট করতে শুরু করে দিয়েছে মধ্য কলকাতার ‘আলিয়া’। পরোটা বানানো আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু পরোটা নয়, যে খাবারগুলি রান্নায় বেশি গ্যাস খরচ হয়, সেগুলি এখন আর রান্না করছে না তারা। আলিয়ার ম্যানেজার মহম্মদ শামিম বলেন, “পরোটা-সহ কিছু আইটেম এখন আমরা বানাচ্ছি না। বিরিয়ানিটা বানাচ্ছি। হালিমের চাহিদা রয়েছে, ওটাও করছি। সঙ্গে কিছু মাংসের আইটেম করছি।”
কিন্তু এই আপৎকালীন বন্দোবস্ত আর কত দিন চলবে? আলিয়ার ম্যানেজার বলছেন, “গ্যাস না-পেলে আইটেম কমিয়েও বেশি দিন চালাতে পারব না। সে ক্ষেত্রে কলকাতায় বাইরে গিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় বিরিয়ানি বানিয়ে আবার কলকাতায় নিয়ে আসতে হবে। তার পরেও না-পারলে, বন্ধ করে দেব! আইন ভেঙে তো আর কিছু করতে পারব না।”
খাবারের আইটেম কমানোর চিন্তাভাবনা করছে ‘আদি বাঙালি’ও। এই সঙ্কটের সময়ে মেনু থেকে মাছের কিছু আইটেম সরিয়ে ফেলার কথা ভাবছে তারা। ‘আদি বাঙালি’র মোট চারটি আউটলেট রয়েছে। তার মধ্যে কলকাতায় একটি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাওড়ার আউটলেটে রান্না করে সেখান থেকে খাবার কলকাতার আউটলেটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে তারা। প্রতিষ্ঠানের মালিক জীতেন্দ্র সিংহ শেট্টী বলেন, “খুব তাড়াতাড়ি কিছু আইটেম কমাতে হবে। ভেজ, নন ভেজ থালি থাকবে যাতে কাউকে ফিরে যেতে না হয়। তবে স্ন্যাক্স কমানো হবে, মাছের কিছু আইটেম, যেমন পাতুরি কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে। দাম একই রেখে কী ভাবে রেস্তরাঁ খুলে রাখা যায় ভাবা হচ্ছে।”
এমন আরও অনেক রেস্তরাঁই সমস্যায় পড়েছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ‘ক্রিস্টাল চিমনি’র মালিক সুকল্যাণ দত্তের কথায়, তাঁদের রেস্তরাঁয় যে ধরনের খাবার রান্না হয়, সেগুলির জন্য আগুনের আঁচ বেশি লাগে। গ্যাস সরবরাহ ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রেস্তরাঁ কত দিন চালু রাখা যাবে, তা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না সুকল্যাণ। তিনি বলেন, “এইটুকু সময়ের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা করার মতো সুযোগ নেই। তার জন্য পরিকাঠামো দরকার। যাঁরা রান্না করবেন, তাঁদের বোঝানো দরকার। তা ছাড়া সব রান্না ইনডাকশন অভেনে সম্ভব না। আগুনের আঁচে রান্নার মতো স্বাদ তাতে আসে না। আপাতত দুই-তিন দিন রেস্তরাঁ চালু থাকবে। তার পরেও পরিস্থিতি ঠিক না হলে, ঝাঁপ বন্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।”
আরও পড়ুন:
কোভিডের সময়েও কিছু দিন বন্ধ থাকার পরে ফের নিয়মবিধি মেনে রেস্তরাঁ চালু রেখেছিলেন সুকল্যাণ। কিন্তু এখন কী হবে, রেস্তরাঁ খোলা রাখা যাবে তো? আপাতত এর কোনও উত্তর নেই তাঁর কাছে। বলছেন, “করোনার সময়েও সামলে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন তো ঢাল, তলোয়ারই থাকছে না, সামলাব কী ভাবে!” তাঁর রেস্তরাঁয় যাঁরা কাজ করেন, সেই কর্মীদের নিয়েও দুশ্চিন্তা সুকল্যাণের। রেস্তরাঁ শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হলে এই কর্মীদের কী হবে, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে ‘ফেডারেশন অফ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’ও। সংগঠনের সহ-সভাপতি সুদেশ পোদ্দার জানান, ইতিমধ্যে একটি রেস্তরাঁ প্রতিষ্ঠানের তিনটি আউটলেট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এই ভাবে চলতে থাকলে দুই-এক দিন পর থেকে আরও বেশ কিছু রেস্তরাঁ ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে। তিনি বলেন, “কেন্দ্রের কাছে আমরা বলেছি, অন্তত চাহিদার ৫০ শতাংশ গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়া হোক। যাতে আমাদের কাজটুকু চলে। এখন আমরা ওয়েট করছি ওরা কী করে তা দেখার জন্য। এই সঙ্কট না মিটলে রেস্তরাঁ, হোটেল বন্ধ হয়ে যাবে। তিনটে আউটলেট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আপাতত এক-দুই দিন চলবে। তার পর আস্তে আস্তে বন্ধ হবে।”
কলকাতার রেস্তরাঁগুলির দূষণ সংক্রান্ত কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়ম অনুযায়ী, কলকাতায় কাঠের উনুনে বা কয়লায় রান্না করতে পারে না রেস্তরাঁগুলি। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসাবে যে সেগুলিকে ব্যবহার করা হবে, সেই উপায়ও নেই কলকাতায়। আবার অনেক রেস্তরাঁয় বড় ইনডাকশন অভেনের ব্যবস্থাও নেই। এত কম সময়ের মধ্যে সেই ব্যবস্থা করাও সম্ভব নয় বলে জানাচ্ছেন রেস্তরাঁ মালিকদের একাংশ। এ অবস্থায় অনেকেই কলকাতার বাইরে গিয়ে রান্না করে, সেই রান্না করা খাবার আবার কলকাতার রেস্তরাঁয় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করতে শুরু করেছে।