বাঙালির মধ্যে বিভাজন তৈরির অপচেষ্টার দিনকালে আজ বার বার তাঁকে আঁকড়ে থাকার কথা উঠে আসছে নানা মহলে। সেই প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভিটেই যেন এক চরম অনাদরের দলিল। নজরুলের ১২৬ বছরের জন্মদিনের আবহে আসানসোলের কাছে চুরুলিয়ায় নজরুলের বাড়ি, গড়ে তোলা প্রদর্শশালা দেখতে ভিড় উপচে পড়ছে। সেই সাবেক ভবনের করুণ ভগ্নদশায় রীতিমতো লজ্জিত দরদী নজরুলপ্রেমীরা। তবে স্থানীয় কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে দ্রুত নজরুল স্মৃতির উপযুক্ত পরিচর্যায় ঐতিহাসিক এই ভূমি যথাযথ চেহারায় সবার জন্য মেলে ধরা হবে।
দেখা যাচ্ছে, সংরক্ষণের অভাবে নজরুল বিষয়ক প্রদর্শনীরও কার্যত দফা রফা। ভাঙাচোরা প্রদর্শশালার ছাদের একাংশ ভেঙে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ছাদের পলেস্তরা খসে কঙ্কাল প্রকট নানা অংশে। প্রদর্শনীর ছবিগুলি বৃষ্টির ঝাপটের সামনে উন্মুক্ত। দেওয়ালে উইয়ের রাজ্যপাট। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি, নজরুল জীবনের নানা পর্বের উপস্থাপনা সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। দু’বছরের বেশি প্রদর্শশালার এই দুর্গতির জন্য স্থানীয়েরা আক্ষেপ করছেন।
প্রদর্শশালায় কবির লেখা চিঠিপত্র পড়া যাচ্ছে না বলেও আক্ষেপ কম নয়। নজরুলপ্রেমীদের অনেকের ক্ষোভ, সংরক্ষণের অভাবে নজরুলের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিরও জীর্ণ দশা। নজরুল, তাঁর স্ত্রী প্রমীলা সেনগুপ্ত, তাঁদের ছেলে সব্যসাচী, অনিরুদ্ধ, বুলবুলদের ব্যবহৃত পোশাক, নানা সামগ্রী, পারিবারিক গ্রামোফোন বা নজরুলের পাওয়া সব পদক, নানা স্মারক দেখতে দেখতেও ওই সব নষ্ট হয়ে আসা চিঠি, পাণ্ডুলিপির জন্য কারও কারও হা-হুতাশ শোনা যাচ্ছে।
প্রদর্শশালার লাগোয়া নজরুল অ্যাকাডেমি। ১৯৫৬ সালে নজরুলের জন্মভিটে ভেঙেই অ্যাকাডেমির দু’তলা বাড়িটি গড়া হয়। বছর চারেক হল সেই নজরুল অ্যাকাডেমি, প্রদর্শশালা থেকে নজরুল মেলা পরিচালনার ভার কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত। কিন্তু অভিযোগ, অ্যাকাডেমি এখন বন্ধই থাকে। চুরুলিয়ার বাসিন্দারা অনেকেই বলছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করার আগেই বরং অ্যাকাডেমিতে জনসাধারণের প্রবেশ অবাধ ছিল। সেখানে নজরুলের লেখা সব বইও লোকে বসে পড়তে পারত। এখন তালা বন্ধ দরজার ও পারে সাধারণত কারও ঢোকাই মুশকিল।”
কবির প্রদর্শশালার রক্ষণাবেক্ষণের দুরবস্থা মেনে নিয়ে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার চন্দন কোনার মঙ্গলবার বলেন, ‘‘প্রদর্শশালা সংস্কারে রাজ্য সরকারের থেকে দেড় কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। উপরের তলায় কাজ শুরু হয়েছে। প্রদর্শশালা এখন বন্ধই ছিল। শুধু নজরুল জয়ন্তীর মেলা উপলক্ষে তা সাময়িক ভাবে খোলা হয়েছে।” রেজিস্ট্রারের দাবি, ‘‘নজরুল অ্যাকাডেমি পুরোটাই ভেঙে ফেলা হবে। কবির জন্মের সময়ের ভিটের আদল ফিরিয়েই নতুন ভবন তৈরি করা হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা চলছে। রাজ্য পর্যটন বিভাগ ও হেরিটেজ বিশারদদেরও আমরা পরামর্শ নিচ্ছি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)