আলুর দাম না পেয়ে তা রাস্তায় ফেলে চাষির বিক্ষোভ গত বিধানসভা ভোটের আগেও দেখেছেন রাজ্যবাসী। ছিল ফড়েদের কাছে ধানের অভাবি-বিক্রির অভিযোগও। রাজ্যে ক্ষমতায় এসে প্রথম বাজেটে আলু সংগ্রহে চাষিদের ভর্তুকি (টপ-আপ) হিসাবে প্রতি কুইন্টালে ২০০ টাকা করে অতিরিক্ত দেওয়ার ঘোষণা করল বিজেপি সরকার। সেই সঙ্গে ধান চাষিদের জন্য সহায়ক মূল্যের সঙ্গে কুইন্টাল পিছু অতিরিক্ত ২০০ টাকা উৎসাহ ভাতা (ইনসেনটিভ) দেওয়া, উন্নত মানের আলুবীজ সরবরাহ, কৃষি-বিদ্যুতে ইউনিট পিছু দু’টাকা ভর্তুকির প্রস্তাবও রয়েছে।
রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত সোমবার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘‘রাজ্যের চাষিদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করতে ও খাদ্যের দামের ওঠা-পড়া থেকে উপভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে ‘প্রধানমন্ত্রী অন্নদাতা আয় সংরক্ষণ অভিযান (পিএম-আশা) চালু হচ্ছে। আলু, টোম্যাটো, পেঁয়াজ, ডাল এবং তৈলবীজের দাম স্থিতিশীল রাখতে ১০০ কোটি টাকার ‘স্টেট প্রাইস স্টেবিলাইজ়েশন ফান্ড’ (মূল্যের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ তহবিল) তৈরি করা হবে।’’ মন্ত্রীর আশ্বাস, অতিফলনের বছরে চাষিদের রক্ষা করতে বাজারে হস্তক্ষেপের ব্যবস্থাও থাকবে।
বাজেট অধিবেশনের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বলেন, ‘‘অন্নদাতা কৃষকেরা এখন কুইন্টাল প্রতি পান ২,৫০০ টাকা করে। তাঁদের বাড়তি ২০০ টাকা করে দেওয়া হবে। ধাপে-ধাপে তা করা হবে ৩,১০০ টাকা। আলুচাষিরা কুইন্টালে ২০০ টাকা করে ভর্তুকি পাবেন। বিদ্যুৎ বিলে ইউনিট প্রতি ২ টাকা করে ছাড় দেওয়া হবে। এতে সরকারের ৮০০ কোটি টাকা খরচ হবে। পরে এই ছাড় আরও বাড়বে।’’
হুগলির বৈদ্যবাটীচক মৌজার ধানচাষি চন্দ্রশেখর ঘোষ বলেন, ‘‘সর্বত্র স্থানীয় ভাবে ধান কেনার ব্যবস্থা করা দরকার।’’ আবার রাজ্যের ‘শস্যগোলা’ পূর্ব বধর্মানের গলসির ধানচাষি মানসচন্দ্র হাজরার দাবি, “চাষের খরচ কুইন্টালে বেড়েছে তিন-চারশো টাকা। সেখানে ২০০ টাকা বাড়ায় পুরোপুরি সুবিধা হবে না।’’ হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের আলুচাষি উত্তম হাজরা বলেন, ‘‘পঞ্জাব থেকে আলুবীজ আসে। আমাদের এলাকাতেই আলুবীজ উৎপাদন হলে চাষিরা উপকৃত হবেন।’’ যদিও কৃষকসভার বর্ধমান জেলা সম্পাদক সুকুল শিকদার বলেন, ‘‘রাসায়নিক সার, কীটনাশকে ভর্তুকি, আলু বিপণন, আলুভিত্তিক শিল্পের দিশা নেই বাজেটে।’’
বহুমুখী কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকিং সেন্টার তৈরিতে ভর্তুকি, আমচাষে পরিকাঠামো উন্নয়ন ও রফতানিতে জোর, পশুপালনে উৎসাহ, মৎস্যচাষে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ঘোষণা, পশুখাদ্য, মশলা, ফুল চাষে আলাদা নজর দেওয়া হয়েছে বাজেটে। চা শিল্পে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের পাশাপাশি, দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে অর্কিড, কিউয়ি, অ্যাভোকাডো চাষে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর জেলার ৩ লক্ষ ৪২ হেক্টর এলাকায় তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হবে। বিশ্বভারতীর রথীন্দ্র কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানী সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘‘ক্ষুদ্রসেচ প্রকল্পেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে চাষিরা যেমন অল্প খরচে স্বল্প জলে চাষ করতে পারবেন, জলের অপচয়ও রোধ করতে পারবেন।’’ তবে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অর্চিতা ঘোষ বলেন ‘‘সেচে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়ার অর্থ, ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। জরুরি ছিল, বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)