ফুটবল খেলে পুরস্কার হিসেবে পাওয়া জমানো টাকা খরচ করে গ্রামবাসীকে চাল, ডাল প্রভৃতি খাদ্য সামগ্রী তুলে দিল একটি আদিবাসী ক্লাব। ‘লকডাউন’-এ ঘরবন্দি গ্রামবাসীর পাশে এ ভাবেই দাঁড়িয়েছে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ‘লোটিহীড় সিদু কানু সাঁওতা সুসৌর গাঁওতা’। শুধু বিষ্ণুপুর মহকুমা নয়, আশপাশের জেলাতেও ফুটবলে তাদের খ্যাতি রয়েছে। সেই সব খেলার আর্থিক পুরস্কার ক্লাবটি জমিয়ে রেখেছিল পরের মরসুমে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার ‘এন্ট্রি ফি’ দেওয়ার জন্য। কিন্তু এখন কঠিন সময়ে গ্রামবাসীর পেট ভরানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ত্রাণ সামগ্রী কিনতে সে টাকা খরচ করল ওই ক্লাব।
বৃহস্পতিবার ক্লাব থেকে বাসিন্দাদের হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। ক্লাবের ক্রীড়া সম্পাদক লক্ষ্মী মুর্মু জানান, শুধু লোটিহীড় গ্রামের ৮০টি পরিবারই নয়, আশপাশের লাগারডাঙা, পানশিউলি, নতুনগ্রামের বাসিন্দাদেরও খাদ্যদ্রব্য দেওয়া হল।
লক্ষ্মীবাবু জানান, এলাকার সবাই দিনমজুর। কেউ লোকের জমিতে কাজ করেন, কেউ ইটভাটায়। কিন্তু এখন সে সব কাজ তেমন নেই। জলের অভাবে বোরো ধানের চাষ বন্ধ। জঙ্গলের শালপাতা তুলে থালা বানিয়ে সংসার চালানোরও উপায় নেই। বাজার বন্ধ। ব্যবসায়ীরাও আসেন না। এ দিকে লোকের হাতে টাকাও নেই। তিনি বলেন, ‘‘তাই তহবিলে জমে থাকা প্রায় ২০ হাজার টাকায় চাল, ডাল, সয়াবিন ও সর্ষের তেল কিনে গ্রামবাসীকে দিয়েছি।’’
গ্রামবাসী জানান, তাঁদের জঙ্গল ঘেরা এলাকা থেকে রেশন আনতে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে কাউকে পানশিউলি , কাউকে তিরবঙ্ক, কাউকে মড়ার গ্রামে যেতে হয়। গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, রেশনে যা পাওয়া যায়, তা আবার অনেক পরিবারের পক্ষে ‘পর্যাপ্ত’ নয়। কাজ বন্ধ থাকায় ভরপেট খাবার পাওয়া নিয়েই তাঁরা দুশ্চিন্তায়।
গ্রামের বয়স্ক বাসিন্দা পার্বতী হেমব্রম, পাতা টুডু বলেন, ‘‘১০ টাকায় ১০০টা শালপাতার থালা বিক্রি করতাম। তাতে কিছু টাকা হাতে আসত। এখন সে সব বন্ধ। আধপেটা খেয়ে কত দিন থাকা যায়!’’ তবে এ দিন ক্লাব থেকে ত্রাণ সামগ্রী পেয়ে তাঁরা খুশি।
তাঁরা বলেন, ‘‘দিন-রাত ফুটবল নিয়ে মেতে থাকত বলে ছেলেগুলোকে কম মুখ ঝামটা দিইনি। কিন্তু আজ সেই ছেলেগুলোই ফুটবল খেলে পাওয়া টাকায় আমাদের খিদে মেটাল।’’ কিন্তু তহবিল তো শেষ। তাই চিন্তায় ক্লাবের সদস্যেরা।
ক্লাবের সম্পাদক গোপীনাথ মুর্মুর বক্তব্য, ‘‘কোনও দিন সরকারি সাহায্য আমাদের ক্লাব পায়নি। কিন্তু ফুটবল পায়ে পড়লে জান বাজি রেখে আমাদের ছেলেরা খেলে। গ্রামের সবাই ঠিক থাকলে, আবার আমরা পুরস্কার নিয়ে এসে তহবিল গড়ে তুলব। কিন্তু ভরপেট খেতে না পারলে কী ভাবে ওই মারণ রোগ ঠেকাব?’’