শরীরে তেমন জোর নেই। দৃষ্টিশক্তিও কমে গিয়েছে। তাই বলে কাজে ইতি টানতে হবে!
নবতিপর নিতাইপদ সূত্রধর অন্তত তেমন বিশ্বাস করেন না। আর করেন না বলেই, এখনও দুর্গা প্রতিমা গড়ে চলছেন সাতানব্বই বছরের ওই তরুণ। মঙ্গলবার ইলামবাজর ব্লকের আকম্বার ওই মৃতশিল্পীর দেখা মিলল পাশের গ্রাম সুগড় বক্সীবাড়ির শতাব্দী প্রাচীন দূর্গা মন্দিরে। প্রতিমা গড়তে গড়তে বললেন, ‘‘শরীরের জোর কমে গিয়েছে ঠিকই। এখন ছেলেরাই প্রতিমা গড়ে। কিন্তু বাড়িতে বসে থাকতে যে কিছুতেই মন চায় না। তাই এখনও এই পরিবারে আসি প্রতিমা গড়তে।’’
কতদিন হল?
চশমার কাচটা খুলে হাসলেন নিতাইবাবু। বললেন, ‘‘সে সাত দশক। হ্যাঁ তা সাত দশক ধরে একই ভাবে চলছে।’’
‘‘বয়সটা কেবল একটা সংখ্যা ছাড়া কিছুই নয় ‘নিতাইকাকা’কে দেখে সত্যিই তাই মনে হয়,’’ বলছেন বক্সী পরিবারের বর্ষিয়ান শরিক শান্তিময় বক্সী। শান্তিময়বাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বয়স সত্তর পেরিয়েছে তাঁরও। বলছেন জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখছি কাকা ঠাকুর গড়ছেন। বছর দশেক আগে আমরা শরিকরা তো ওঁর ফেয়ার ওয়েল করেছিলাম। ভেবছিলাম এত বয়সে আর ওঁকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। কিন্তু কাকা আসা থামাননি।’’
শরিক পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কতদিন আগে দুর্গাপুজো শুরু সেটার প্রামাণ্য নথি না থাকলেও সাতপুরুষের হিসাব রয়েছে তাঁদের। একদা সাত পরিবারের দুর্গাপুজো এখন ২৩টি পরিবারের। অদূর ভবিষ্যতে শরিক সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়বে। শরিকদের মধ্যে একঘর মিত্র পরিবার ছাড়া সকলেই বক্সী পদবিধারী। সদস্য শান্তিময় বক্সী, সমীরণ বক্সী, শ্রীমন্ত বক্সী, সনৎ মিত্ররা বলছেন, শরিকদের অনেকই আর এখন গ্রামে থাকেন না। কিন্তু দুর্গাপুজোয় সকলেই আসেন। খুব আনন্দ হয়। এটাই আমাদের কুলদেবীর মন্দির। পুজোর আঙ্গিকে তেমন কোনও তফাত না থাকলেও একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় আমাদের এক পূর্বপুরুষের হাতে এক সন্ন্যাসী একটা পুথি দিয়ে গিয়েছিলেন। শতাব্দী প্রাচীন পুথিতে কী আছে জানা বারণ। দুর্গাপুজোর সময় ওই পুথিকে সামনে রেখেই পুজো হয়।
তাঁরা বলেন, ‘‘আর দ্বিতীয় যে বিষয়টা না বললেই নয়, সেটা হল কাকার এতবছর ধরে ঠাকুর গড়তে আসা। উনি যেন আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছেন।’’
বাবার সঙ্গে বক্সী পরিবারের প্রতিমা গড়তে এসেছেন ছেলে বৈদ্যনাথ সূত্রধর। বেশ কয়েক বছর ধরে এটাই রীতি। কিন্তু ছেলে ঠাকুর গড়লেও হাত না লাগিয়ে পারেন না নিতাইপদ সূত্রধর। বৈদ্যনাথ বলছেন, ‘‘বাবা এখনও ঠাকুর গড়ার সবটাই করতে পারেন।’’ যদিও অন্য আর পাঁচটা জায়গায় যান না নবতিপর ওই তরুণ।
ঠিকই বলছেন কাকা, উনি না এলে কেমন মনখরাপ লাগে। বলছেন, পরিবারের মহিলা সদস্য মীরা ঘোষ, কৃষ্ণা বক্সী, দেবযানী বক্সীরা।