বিজয়া-দীপাবলির শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে দলের পুরনো কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল। তৃণমূলের প্রতিষ্ঠালগ্নে বাম বিরোধী লড়াইয়ে যে সমস্ত কর্মীরা ছিলেন, শুভেচ্ছাপত্র পাঠানোর মধ্যে দিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানান দলের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি তথা জেলা সভাপতি সৌমেন বেলথরিয়া।
জেলা তৃণমূল সভাপতির কথায়, ‘‘যখন দল তৈরি হয়েছিল, সে সময়ে আমি স্কুলছাত্র ছিলাম। শুভেচ্ছাপত্রের মাধ্যমে সেই সমস্ত কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য ‘আশীর্বাদ যাত্রা’ নামে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।’’
তৃণমূল সূত্রের দাবি, পুরভোটের আগে মূলত শহরাঞ্চলের কর্মীদের মাঠে নামানোই যে এই কর্মসূচির লক্ষ্য, তা স্পষ্ট। দুর্গাপুজো, কালীপুজো-সহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে ফুটবল খেলা-সহ সামাজিক কর্মসূচিগুলিতে, বিশেষত পুরসভা এলাকাগুলিতে বৈঠক করে দলের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের যে ভাবে মাঠে নামতে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা নেতৃত্ব, তাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। গত লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে কর্মীদের ভূমিকা এবং এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট কর্মীর অবস্থানের বিষয়গুলি জেলা নেতৃত্বের নজরে রয়েছে। আগামী পুরভোটে প্রার্থী হওয়ার পিছনে এই বিষয়গুলি মাথায় রাখার বিষয়ে উচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশ মিলেছে বলে জেলা তৃণমূল সূত্রের দাবি।
আগামী পুরভোটের আগে সব নেতা-কর্মী এক সঙ্গে রাস্তায় নামুন, চাইছেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের নানা সূত্রের দাবি, পুরুলিয়া, রঘুনাথপুর ও ঝালদা— জেলার তিনটি পুরসভাতেই দলের ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব’ এখন মাথাব্যথা। লোকসভা ভোটের পরে গত বিধানসভা ভোটে তিনটি পুরসভাতেই দলের ভরাডুবি হয়েছে। বিরোধীদের কাছে সিংহভাগ ওয়ার্ডেই পিছিয়ে তৃণমূল। পুরুলিয়ায় ২৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে বিজেপির থেকে পিছিয়ে তৃণমূল। ঝালদায় ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে দশটিতে এগিয়ে বিজেপির সহযোগী দল আজসু। রঘুনাথপুরে ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র দু’টিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল।
বিধানসভা ভোটে পুর এলাকায় এমন ফলের পরে প্রশ্নের মুখে তিন এলাকার তৃণমূল নেতৃত্বই। তৃণমূল সূত্রের খবর, ফলাফল পর্যালোচনায় দলীয় তদন্তে পুরুলিয়া পুরসভা এলাকায় একাধিক ওয়ার্ডে ‘অন্তর্ঘাতের’ বিষয়টি উঠে এসেছিল। তাই পুরুলিয়া বিধানসভার পঞ্চায়েত এলাকায় ফল ভাল হলেও, শহরে দলের তরী ডুবেছে। কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে দলের বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে কাউন্সিলরদের দূরত্বের বিষয়টি। যার ফলে, বিভিন্ন ওয়ার্ডে একাধিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি, কিছু এলাকায় পুরসভার কাজকর্ম নিয়ে অসন্তোষের ঘটনাও প্রভাব ফেলেছে বিধানসভা ভোটে, মত দলের একাংশের। ঝালদা এবং রঘুনাথপুরেও এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে শিক্ষা দিতে গিয়ে দলকেই সমস্যায় ফেলেছে, এমন বিষয় দলীয় পর্যালোচনায় উঠে এসেছে বলে শাসক দল সূত্রের দাবি।
আগামী পুরভোটে এই তিনটি পুরসভার বোর্ডের ক্ষমতা দখল শাসক দলের কাছে পাখির চোখ। জেলা সভাপতি সৌমেন বেলথরিয়া বলেন, ‘‘তিনটি পুর এলাকাতেই যেমন দলের পুরনো কর্মীরা রয়েছেন, তেমনি গত নির্বাচনে কিছু নতুন কর্মীও উঠে এসেছেন। পুজো-পার্বণ এবং নানা সামাজিক কর্মসূচিতে সংগঠকদের সহায়তার জন্য পাশে থাকতে বলা হয়েছে দলীয় কর্মীদের। প্রতিটি কর্মীর কাছে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে, পুরভোটকে পাখির চোখ করে নামতে হবে। রাজ্য সরকারের যে সমস্ত প্রকল্প রয়েছে এবং যা কাজ হয়েছে, তা সামনে রেখে মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুললে, মানুষ পাশে থাকবেন।’’ বিধানসভা ভোটের পরে পুরুলিয়া শহরের কংগ্রেস প্রার্থী পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ শহর কংগ্রেসের কিছু নেতা-কর্মী তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় দলের শক্তি বেড়েছে বলে মনে করছেন শাসক দলের নেতারা।
সৌমেনবাবু অবশ্য বলেন, ‘‘প্রত্যেকেই আমরা দলের সৈনিক। শুধু ভোট-যুদ্ধ নয়, সব সময় দলের জন্য সে ভূমিকা পালন করতে হবে। শুভেচ্ছাপত্রে সে কথাই সকলকে জানাচ্ছি।’’ জেলা সভাপতি সম্প্রতি একটি নম্বর দিয়ে সেখানে হোয়াটসঅ্যাপ করে নানা সমস্যার কথা জানানোর আর্জি জানান। সেখানে বাসিন্দাদের তরফে নানা সমস্যার কথা উঠে আসছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পুরুলিয়ার বিজেপি বিধায়ক তথা বিদায়ী পুরবোর্ডের বিরোধী দলনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘‘২০১০ থেকে পুরুলিয়া পুরসভায় ক্ষমতায় তৃণমূল। এত দিন পরে ওদের মানুষের সমস্যা শোনার কথা মনে পড়ল?’’
তাঁর আরও দাবি, ‘‘সমস্যা জানতে জেলা সভাপতিকে নম্বর দিতে হচ্ছে, তাতেই বোঝা যাচ্ছে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা কতটা জনবিচ্ছিন্ন
হয়ে পড়েছেন।’’