মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পাহাড় বাদ দিয়েই কাশীপুরে পাথর কাটার প্রকল্প রূপায়িত করতে চাইছে রাজ্যর শিল্প দফতর। কী ভাবে পাহাড়টিকে বাঁচিয়ে প্রকল্পের কাজ করবে মিনারেল ডেভলেপমেন্ট অ্যান্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমি়টেড (এমডিটিসি), সে বিষয়ে সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সোমবার নবান্নে শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্রের সঙ্গে আলোচনা করলেন পাহাড় বাঁচাও কমিটির কর্মকর্তারা।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো, কাশীপুরের বিধায়ক স্বপন বেলথরিয়া, মানবাজারের বিধায়ক সন্ধ্যারানি টুডু, এমডিটিসি-র চেয়ারম্যান অম্লান বসু, পুরুলিয়ার জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী প্রমুখ। আলোচনায় স্থির হয়েছে, পাহাড়ের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এবং ওই নির্ধারিত এলাকায় কোনও রকম খনন কাজ হবে না। পাশাপাশি কাশীপুর ব্লকের বড়রা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা বেশ কিছু অবৈধ ক্রাশারকে কী ভাবে সরকারি নিয়মের মধ্যে আনা যায়, সে বিষয়েও একপ্রস্ত আলোচনা হয়েছে এ দিনের বৈঠকে। শান্তিরামবাবু বলেন, ‘‘শিল্পমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সদর্থক আলোচনা হয়েছে। আগামী ৫ অক্টোবর স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে ওই এলাকায় গিয়ে সরেজমিন সমীক্ষা করে পাহাড়টির সীমানা নির্ধারণ করবেন এমডিটিসি ও প্রশাসনের কর্তারা।”
বড়র পঞ্চায়েতের পলসড়া মৌজায় ধনারডি গ্রামের পাহাড় কেটে পাথর বের করার কাজ শুরু করেছিল এমডিটিসি। কিন্তু, স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন, জীবিকা ওই পাহাড়ের উপরে নির্ভরশীল এবং পাহাড় কাটা হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে— এই দাবি তুলে পাহাড় রক্ষার্থে আন্দোলন শুরু করেছিল স্থানীয় পাহাড় বাঁচাও কমিটি। আন্দোলনে সামিল হয়েছেন ধনারডি, রাঙ্গুনিগোড়া, পাহাড়পুর, পলসড়ার মতো পাঁচ-ছটি গ্রামের বাসিন্দারা। এঁদের বেশির ভাগই আদিবাসী সম্প্রদায়ের। আন্দোলনের জেরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে হয় এমডিটিসি-কে। পাহাড় রক্ষায় আদিবাসীদের সক্রিয় আন্দোলনের খবর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছনোয় সম্প্রতি তিনি নবান্নে ডেকে পাঠান পাহাড় বাঁচাও কমিটির কর্মকর্তাদের। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় কেন তাঁরা পাহাড় বাঁচাতে আন্দোলনে নেমেছেন, তার ব্যাখ্যা দেন কমিটির কর্মকর্তারা। ওই আলোচনার পরে পাহাড় কাটা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু, পাহাড় বাঁচিয়ে কী ভাবে এমডিটিসি কাজ করবে, মুখ্যমন্ত্রী তার রূপরেখা স্থির করতে শিল্পমন্ত্রীকে বলেন। সেই মতো সব পক্ষকে নিয়ে সোমবার নবান্নে বৈঠক করেন শিল্পমন্ত্রী।
পাহাড় রক্ষা কমিটির অন্যতম দুই কর্মকর্তা জয়ধন মান্ডি, কমলাকান্ত হাঁসদা জানান, তাঁরা এমডিটিসি-র প্রকল্পের বিরোধী নন। শুধুমাত্র পাহাড় কেটে পাথর বের করার কাজের বিরোধিতা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী পাহাড় কাটা চলবে না, এই নির্দেশ দেওয়ায় কী ভাবে পাহাড় বাঁচিয়ে প্রকল্প রূপায়িত করবে তা এমডিটিসিকেই স্থির করতে হবে। ওই প্রকল্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানের দাবিও শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় তুলেছিল কমিটি।
আপাতত স্থির হয়েছে, পাহাড় বাদ দিয়ে বাকি যে ১৯টি মৌজা থেকে এমডিটিসি পাথর বের করার কাজের লিজ পেয়েছে, সেখানে মাটি খুঁড়ে পাথর খাদান তৈরি করবে এমডিটিসি। তাতে এলাকাবাসীর কর্মসংস্থান হবে। পরে ওই পাথর থেকে স্টোন চিপস তৈরিতে কাজে লাগানো হবে স্থানীয় ক্রাশারগুলিকে। সেখানেও কাজ পাবে স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে, তার আগে ক্রাশারগুলিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বৈধতা পেতে সাহায্য করা হবে। ক্রাশারে দৈনিক ২০১ টাকা হারে শ্রমিকেরা মজুরি পাবেন বলেও বৈঠকে ঠিক হয়েছে। কমলাকান্তবাবু বলেন, ‘‘পাহাড় বাঁচিয়ে কাজ করা ও স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের দাবি আমরা তুলেছিলাম। রাজ্য সরকারের শীর্ষ স্তরে ওই দু’টি বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।”