ঘরের মেঝেতে পরপর ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল দুই শিশু-সহ এক দম্পতির।
মঙ্গলবার বীরভূমের মুরারই থানার রাজগ্রামের ঘটনা। পুলিশ জানায়, মৃতেরা হলেন সিরাজুল হক (৬০), তাঁর স্ত্রী নাফিসা বিবি (৪৫), ছেলে কবিরুল হক (৭) এবং মেয়ে বিলকিস বেগম (৩)। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, ঘরের বিদ্যুৎবাহী তার ছিঁড়ে তড়িদাহত হয়ে ওই চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এসডিপিও (রামপুরহাট) সৈয়দ মহম্মদ মামদুবুল হাসান বলেন, ‘‘বাইরে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে হুকিং করে ওই বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ টানা হয়েছিল। ঘরে থাকা একটি তার মৃতদেহের উপরে ছিঁড়ে পড়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে তাই মনে হচ্ছে, ঘুমন্ত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওই চার জনের মৃত্যু হয়েছে।’’ রাতে সিরাজুলের প্রথম পক্ষের ছেলেদের বিরুদ্ধে নাফিসার বাপের বাড়ির পক্ষ থেকে খুনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ দিনই দেহগুলি উদ্ধার করে ময়না-তদন্তে পাঠিয়ে তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে সিরাজুল নাফিসাকে বিয়ে করেছিলেন। সিরাজুলের প্রথম পক্ষের পাঁচ ছেলেমেয়ে আছে। তাঁদের মধ্যে বড় ও ছোট ছেলে বাবার সঙ্গে থাকেন। ঘটনার রাতে বড় ছেলের পরিবার বাইরে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিল। পেশায় রাজমিস্ত্রি, বছর আঠারোর ছোট ছেলে খাবির শেখ বাড়িতেই ছিলেন। রাতে সিরাজুল এবং তাঁর স্ত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভিতরের ঘরের মেঝেতে শুয়ে ছিলেন। খাবির ছিলেন বারান্দা লাগোয়া অন্য একটি ঘরে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনিই প্রথম ঘটনাটি জানতে পারেন বলে দাবি।
এ দিন সকালে রাজগ্রাম-মহুরাপুর রাস্তার উপর গ্রামের মারিয়া পাড়ায় এক পড়শির বাড়িতে খাবিরের দেখা মিলল। তাঁর দাবি, ‘‘সকাল ৬টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা-মা, ভাইবোন কেউ ওঠেনি। ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখি সবাই ঘুমোচ্ছে। ডাকার জন্য যেই বাবার গায়ে হাত দিতেই বিদ্যুতের ঝটকা লাগল। আমি সেখান থেকে কোনও রকমে ছিটকে বেরিয়ে আসি।’’ এক প্রতিবেশিকে ঘটনার খবর দেন খাবির। স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হয়ে হুকিংয়ের তার খুলে ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। খবর দেওয়া হয় পুলিশে।
প্রাথমিক তদন্তে তড়িদাহত হওয়ার বিষয়টি উঠে এলেও ওই চারজনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ সূত্রের খবর, বসতবাটির জায়গা বিক্রি নিয়ে আগের পক্ষের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সিরাজুলের দীর্ঘ দিন ধরে বিবাদ চলছিল। সোমবার জমি রেজেস্ট্রি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, অফিসে লিঙ্ক খারাপ থাকায় তা হয়নি। খুঁটি থেকে ২৩০ ভোল্টের বিদ্যুৎবাহী তারের মাধ্যমে সিরাজুলের ঘরটিতে একটি বোর্ড থেকে ফ্যান, লাইট ও নাইট ল্যাম্প জ্বলত। একই বোর্ড থেকে সিরাজুলের প্রথম পক্ষের বড় ও ছোট ছেলের ঘরের লাইট, ফ্যানও জ্বলত। নাইট ল্যাম্পের তারটিই কোনও ভাবে সিরাজুলের ঘুমন্ত দেহের উপরে ছিঁড়ে পড়েছিল। প্রায় ১২ ফুট লম্বা ওই তারের নানা জায়গা আবার কাটা ছিল। কিন্তু, মৃতদেহগুলি যে সুনিপুণ ভাবে শুয়ে ছিল, তাতে সন্দেহ বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ, গোটা ঘটনায় গভীর অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাও করছেন। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, গোটা ঘরটি তড়িদাহত হয়ে পড়লে ঠিক পাশের ঘরে শুয়ে থাকা খাবির শেখের কিছু হয়নি কেন। একই সঙ্গে অনেকের দাবি, মাত্র ২৩০ ভোল্টের বিদ্যুৎবাহী তারের শকে এ ভাবে কেউ মারা যেতে পারে না। পুলিশ যদিও সব দিকই খতিয়ে দেখছে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে এসডিপিও বলেন, ‘‘মৃতের আগের পক্ষের ছেলেমেয়েদের থানায় ডাকা হয়েছে। ওই ঘটনায় সমস্ত রকম সম্ভাবনায় খতিয়ে দেখা হবে।’’