E-Paper

তৎপরতা শূন্য, তাই কি অগ্নি-বিধি শিকেয় পঞ্চায়েত এলাকায়

নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে মোমোর গুদামে আগুন লেগে একাধিক মৃত্যুর মতো ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার আশপাশেও ঘটেনি। চলতি জানুয়ারিতেই চম্পাহাটিতে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে তিন জনেরমৃত্যু হয়েছে।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়, সমীরণ দাস 

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩২

—প্রতীকী চিত্র।

কখনও নাজিরাবাদ, কখনও নীলগঞ্জ। কোথাও জ্বলন্ত কারখানায় আটকে পুড়ে মৃত্যু হয় শ্রমিকের। কোথাও আবার বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে কারখানা, মৃত্যু হয়েছে মানুষের।প্রতি বারই বেআইনি কারখানার দায় নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে ঠেলাঠেলি হয়েছে। যার জেরে কারখানা কিংবা গুদামে আগুন নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে মোমোর গুদামে আগুন লেগে একাধিক মৃত্যুর মতো ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার আশপাশেও ঘটেনি। চলতি জানুয়ারিতেই চম্পাহাটিতে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে তিন জনেরমৃত্যু হয়েছে। আবার, ২০২৪ সালে একই ধরনের দুর্ঘটনায় দু’জন মারা গিয়েছেন। তার আগে ২০২৩ সালে দত্তপুকুরের নীলগঞ্জের মোচপোলে বাজির কারখানায় বিস্ফোরণে ন’জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে সোদপুরের কাছে বিলকান্দার তালবান্দায় গেঞ্জির কারখানায় আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল চার জনের। ২০১৮ সালে ওই এলাকাতেই চেয়ার কারখানায় আগুনে পুড়ে পাঁচ জন মারা গিয়েছিলেন।

লক্ষণীয় হল, প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে কলকাতা সংলগ্ন পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে। কোথাও কারখানার নকশার অনুমোদন দেওয়ার কথা গ্রাম পঞ্চায়েতের, কোথাও পঞ্চায়েত সমিতির কিংবা জেলা পরিষদের। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার পরে প্রথমে দায় ঠেলাঠেলি হয়েছে। কিছু দিন যেতে না যেতেই বহাল তবিয়তে সুরক্ষা-বিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসা চালু হয়ে গিয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, যেখানে জমিতে কোদাল পড়লে এলাকার রাজনৈতিক নেতারা চাঁদা নিতে চলে আসেন, সেখানে বছরের পর বছর ধরে অনিয়মে ভর করে কারখানা চলছে, আর তা প্রশাসন জানতে পারছে না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

জলাভূমি ভরাট করে গড়ে ওঠা নাজিরাবাদের গুদামগুলি যে পঞ্চায়েতের অধীনে, সেই খেয়াদহ ২ পঞ্চায়েতের প্রধান মিতা নস্করের দাবি, ‘‘ওই গুদামগুলির সঙ্গে পঞ্চায়েতের সম্পর্ক নেই। পঞ্চায়েত এদের থেকে কোনও কর পেত না। সম্প্রতি একটি কমিটি‌ গড়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখার পরে ওই এলাকার একাধিক গুদামের মালিককে নোটিস ধরানো হয়েছে।’’

আবার, বাজি কারখানা কিংবা জলাভূমি ভরাটের বিষয়টি জেলা পরিষদ দেখে না বলেই দাবি করেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি নীলিমা মিস্ত্রি বিশাল। তিনি বলেন, “যত দূর জানি, এগুলি জেলা পরিষদের এক্তিয়ারে পড়ে না। তা-ও খোঁজ নিয়ে দেখব।”

দায় এড়ানোর যুক্তিতে প্রায় কাছাকাছি রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনও। বিলকান্দার তালবান্দা-বোদাই শিল্পাঞ্চলে দু’দফায় অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যু হয়েছে, তা জানে স্থানীয় বিলকান্দা-১ গ্রাম পঞ্চায়েতও। প্রায় পাঁচশো কারখানা সেখানে। প্রচুর কারখানা যে বেআইনি ভাবে চলছে, তা বিলক্ষণ জানেন পঞ্চায়েতের লোকজন। পঞ্চায়েত প্রধান প্রবীর দাসের কথায়, ‘‘বড় বড় কারখানা রয়েছে। ওদেরনকশা অনুমোদন করার এক্তিয়ার আমাদের নেই। কিন্তু আমরা জানি, সে সব কারখানা জেলা পরিষদ থেকেও নকশা অনুমোদন করেনি। এতে সরকার কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।জেলা পরিষদ-সহ সর্বত্র বিষয়টি জানিয়েছি।’’

উত্তর ২৪ পরগনার দমকল বিভাগ জানাচ্ছে, কারখানার কলেবর অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অগ্নি-বিধি মানতে হয়। সেই অনুযায়ী ছাড়পত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সিংহভাগ কারখানাই সেই মূল্য দিতে নারাজ। যে কারণে তারা ছাড়পত্র নিতেই আসে না। জেলার এক পদস্থ দমকল আধিকারিকের অভিযোগ, ‘‘এমন বেশির ভাগ কারখানার কোনও ফায়ার লাইসেন্স নেই। তা সত্ত্বেও কারখানা চলছে কী ভাবে, সেটা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দেখার কথা। বইমেলা শেষ হলে এ সব খতিয়ে দেখা শুরু হবে।’’

বিভাগ আলাদা হতেই পারে। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনের নিজেদের মধ্যে এটুকু তৎপরতা থাকবে না? একটা শিল্পাঞ্চলকে সুষ্ঠু ভাবে চালাতে দায় ঠেলাঠেলি কি এড়ানো যায় না? উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সহ-সভাধিপতি বীণা মণ্ডল বলেন, ‘‘যত দূর জানি, সবটা নজরদারি করা হয়। তা-ও খোঁজ নেব।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fire Fire Brigade

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy