ঘোষণার সঙ্গে মিল নেই বাস্তবের। বড়সড় গরমিলের আভাসও মিলছে। তাই আবাস প্রকল্পে বিগত সরকার এবং তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ভূমিকা আতশকাচের তলায় আসতে চলেছে বলে ইঙ্গিত নবান্নের অন্দরে। অভিযোগ, উপভোক্তা তালিকার যাচাই থেকে অর্থ-বরাদ্দের অনুমোদন, মানা হয়নি সরকারি কোনও পদ্ধতি। রাজ্যে পালাবদলের পরে পঞ্চায়েত দফতর আচমকা জেলাগুলিকে উপভোক্তা তালিকা যাচাইয়ের বার্তা দিয়েছে। তাতে প্রশাসনের অন্দরের বিস্ময় আরও বেড়েছে— তবে কি তদন্তের আঁচ পেয়েই তড়িঘড়ি যাচাই-সিদ্ধান্ত!
প্রশাসনের অন্দরের ব্যাখ্যায়, প্রশ্ন উঠছে তিন ধরনের। এক, সর্বশেষ যে ১৬ লক্ষ উপভোক্তাকে বাড়ি তৈরির টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই তালিকার যাচাই ছিল না? দুই, দফতরের আচমকা শুরু যাচাইয়ের তথ্যে উপভোক্তা সংখ্যা প্রায় ৩০.৬৫ লক্ষ। সরকারি ঘোষণার অতিরিক্ত সংখ্যা জুড়ল কবে এবং কী ভাবে! তিন, এই উপভোক্তাদের প্রথম কিস্তি বাবদ দেওয়া প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল কি!
গত লোকসভা ভোটের আগে তৎকালীন তৃণমূল সরকার ঘোষণা করেছিল, কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার (পিএমএওয়াই) টাকা না দেওয়ায়, ওই প্রকল্পে তালিকাভুক্ত উপভোক্তাদের বাড়ি তৈরির টাকা ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের নামে দেবে রাজ্য সরকারই। সেই মতো দু’টি ভাগে প্রথমে ১২ লক্ষ উপভোক্তাকে মাথাপিছু ১.২০ লক্ষ করে টাকা দেওয়া হয়। পরে আরও ১৬ লক্ষ উপভোক্তাকে সেই টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে বিগত সরকার। গত বিধানসভা ভোটের আগে তড়িঘড়ি সেই উপভোক্তাদের প্রথম কিস্তির টাকা (মাথাপিছু ৬০ হাজার টাকা করে) দিতেও শুরু করে তারা। প্রশ্ন উঠেছে পরের এই ধাপটিকে কেন্দ্র করেই।
অভিজ্ঞ কর্তারা জানাচ্ছেন, পিএমএওয়াই তালিকায় উপভোক্তাদের বৈধতা, একের টাকা অন্যকে দেওয়া, প্রকৃত গৃহহীনদের বদলে তৃণমূল নেতাদের অনেককে অসাধু উপায়ে তালিকাভুক্ত করা ইত্যাদি বিস্তর অভিযোগ ওঠে তখনকার সরকারের বিরুদ্ধে। প্রমাণ মেলায় কেন্দ্র প্রকল্পের বরাদ্দ বন্ধ করে দেয়। রাজ্যকে বলা হয়, উপভোক্তা তালিকা থেকে জল বার করতে হবে। মানতে হবে কেন্দ্রের সব বিধি। কার্যত মুচলেকা দিয়ে তৎকালীন মুখ্যসচিবকে জানাতেও হয়, এমন গরমিল আর হবে না। পরবর্তী কালে এ রাজ্যের মোট ২৮ লক্ষের মধ্যে ১২ লক্ষ উপভোক্তার যাচাই হয় নিবিড় ভাবে এবং কেন্দ্রের বিধি মেনে। সেই ১২ লক্ষকেই প্রকল্পের জন্য অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। অনুমোদিত ছিল না ১৬ লক্ষ উপভোক্তার তালিকাটি।
নিজেরা প্রকল্পের খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে তৎকালীন সরকার বলে দেয়, কেন্দ্রের অনুমোদন থাকা ১২ লক্ষের পাশাপাশি অনুমোদন না থাকা ১৬ লক্ষ উপভোক্তাকেও টাকা দেওয়া হবে। বলা হয়, ১৬ লক্ষের সঙ্গে যুক্ত হবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাড়ি ভেঙে যাওয়া মানুষদের নামও। তার ভিত্তিতেই গত বিধানসভা ভোটের আগে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয় এক এক জনকে। তাৎপর্যপূর্ণ, এখন দেখা যাচ্ছে, উপভোক্তার সংখ্যা ১৬ লক্ষ ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৩০. ৬৫ লক্ষে। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, বাকি ১৪.৬৫ লক্ষ উপভোক্তা পাওয়া গেল কোথা থেকে! কোনযাচাইয়ে সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত হলেন? সরকারি হিসাব, ওই ১৪.৬৫ লক্ষকে দিতে খরচ হয় ৮৭৯০ কোটি টাকা। এই খাতে সরকারের মোট খরচ হয় প্রায় ১৮,৩৯০ কোটি টাকা।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বুধবার পর্যন্ত যাচাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ জেলাতে পুনর্যাচাইয়ের কাজ ৮% ছুঁতে পারেনি। মাত্রচারটি জেলায় যাচাই-অগ্রগতি ১০-১৩ শতাংশের মধ্যে। এক কর্তার কথায়, “এই তথ্যই বলে দিচ্ছে, যাচাই শুরু হয়েছে খুব সম্প্রতি। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন কেন তা করতে হল? সরকারি নিয়মে তো টাকা দেওয়ার আগেযাচাই হওয়ার কথা!”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)