রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডিং বম্বেয় বসে হয় না কী! আশা ভোঁসলে বলতেন, পঞ্চম (রাহুল দেব বর্মণ) আমায় বলেছে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে হলে কলকাতায় যেতেই হবে।
সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষদের সুরে বাংলা ছবির গান পেলে গাইতে ক্লান্তি ছিল না আশার। কিন্তু সে-সব রেকর্ডিং সাধারণত হত আরব সাগর পারের স্টুডিয়োয়। রবীন্দ্রগানের ক্ষেত্রে নিয়মটা খাটল না।
আশা ভোঁসলের সেই রবীন্দ্রসঙ্গীত অভিযানের সহযোগী, গানের ট্রেনার শিল্পী সঙ্ঘমিত্রা গুপ্ত রবিবার বলছিলেন, এইচএমভি-র সন্তোষ সেনগুপ্তের কথায় আশাজির জন্য সাত দিনে ১৪টি রবীন্দ্রসঙ্গীত আমি গেয়েছিলাম ১৯৭৯-তে। সেই গান ক্যাসেট-বন্দি হয়ে মুম্বই পাড়ি দিল। কিন্তু আশাজির রেকর্ডিংয়ের ডেট মিলল, পাক্কা এক বছর বাদে। ১৯৮০-তে দমদমে এইচএমভি-র স্টুডিয়োয় সাত দিন ধরে দু’টি করে গান রেকর্ড করেন আশা। আর সেই গানেরসূত্রেই সুবিনয় রায়, মায়া সেনদের ছাত্রী সঙ্ঘমিত্রাকে আপন করে নেন তিনি।
বন্ধুতার অধ্যায় দমদমের স্টুডিয়ো ছাড়িয়ে পরে সঙ্ঘমিত্রার লেক রোডের বাড়ি বা মুম্বইয়ের পেডার রোডের প্রভু-কুঞ্জে আশার বাড়িতেও ডানা মেলেছে। কিংবা দক্ষিণী-র শুভ গুহঠাকুরতা, মঞ্জুলা গুহঠাকুরতাদের শাড়ির দোকান ‘কুন্দহার’এও তা অমলিন। সঙ্ঘমিত্রা বলেন, ‘‘রেকর্ডিংয়ে অসম্ভব সিরিয়াস আশাজির সান্নিধ্য থেকে দারুণ আন্তরিক এক দিদির আদরও আমি পেয়েছি।’’
গানের বাণী মরাঠি বা হিন্দিতে লিখিয়ে নিতেন আশা। রবীন্দ্রসঙ্গীতে আশাজির তালিমের জন্য পরিষ্কার কণ্ঠ, উচ্চারণের এক জন শিল্পীকে খুঁজছিল এইচএমভি। সঙ্ঘমিত্রা বলেন, ‘‘কিছু উচ্চারণ বা মানে আমার থেকে জেনে নিতেন আশাজি। এখানকার শিল্পীদের মধ্যে রজনীকান্তের দৌহিত্র সুরকার দিলীপকুমার রায়কে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন তিনি। ‘তোমারই ঝর্নাতলার নির্জনে’ গেয়ে তো বললেন, সঙ্ঘমিত্রাকে আমি পুরো কপি করে দিয়েছি।’’
পরে সঙ্ঘমিত্রার বাড়িতে লুচি, পায়েস খেয়ে ছাদের বাগান, পাখির খাঁচা ঘুরে দেখেছেন আশা। মুম্বইয়ে সঙ্ঘমিত্রারা সপরিবার বেড়াতে গেলে আশাজি তাঁর বাড়িতে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ‘‘ওঁর বাড়িতে নিজের লোকের মতো পাশাপাশি শুয়ে-বসে আড্ডারও সুযোগ হয়েছে আমার’’, বলছিলেন সঙ্ঘমিত্রা। দু’টি অভিজ্ঞতা স্মরণীয়। পাশের ফ্ল্যাটে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দেখা করতে চাই বলায় সঙ্গে সঙ্গে রাজি আশা। একটু বাদে লতাজি নিজে বোনের ফ্ল্যাটে এসে আন্তরিক আলাপ করে গেলেন। খেতে বসে আশার অনুরোধে মরাঠি রান্নায় সামুদ্রিক গেঁড়িগুগলিও চাখতে হয়েছিল সঙ্ঘমিত্রাকে। তিনি বলেন, ‘‘আমায় জোর করে বললেন, নাও তো একটু, ডান হাতেই নাও! আমি অবশ্য ওটা ঠিক খেতে পারিনি। ভাতের তলায় চাপা দিয়ে এড়িয়ে যাই!’’
পরে এক বার গুলাম আলির গানের রেকর্ডিং করতেও কলকাতায় আসেন আশা। তখন আশাজির অনুরোধে তাঁর কন্যা বর্ষাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন সঙ্ঘমিত্রা।‘‘আমার খুব মজার লাগত, বর্ষা গীতা দত্তের গান গাইতে খুব ভালবাসত!’’ শেষ বার সঙ্ঘমিত্রার বাড়িতে আশার আসা, ১৯৮৮-তে। তখন এক কঠিন পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে বৈষ্ণোদেবী দেখতে গিয়ে কপ্টার দুর্ঘটনায় সঙ্ঘমিত্রা তাঁর স্বামী তপন এবং ১৯ বছরের মেয়ে শ্রীলেখাকে হারিয়েছেন। ‘‘আশাজি আমার বাড়িতে এসে বলেছিলেন, তুমি শুধু গানে ডুবে যাও! দু’ঘণ্টার জায়গায় চার ঘণ্টা রেওয়াজ করো। ওটাই আশ্রয়,’’ বললেন সঙ্ঘমিত্রা। শুধু শিল্পী নয়, বড় মনের মানুষ আশা ভোঁসলের স্মৃতিও খোদাই হয়ে আছে তাঁর কাছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)