Advertisement
৩১ জানুয়ারি ২০২৩

রাজসিক শপথে কর্ত্রীর হাতেই কর্তৃত্বের বার্তা

রাজ্যপাল এম কে নারায়ণনের অনুরোধে সে দিন চায়ের সঙ্গে কুকিজ তুলে নিয়েছিলেন শুধু। এ বার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নীতীশ কুমার, লালুপ্রসাদ, অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরীবালদের বললেন ভেটকির পাতুরিটা চেখে দেখতে। বাংলার একেবারে নিজস্ব পদ বলে কথা!

আপ্যায়ন। নীতীশ কুমার ও অরবিন্দ কেজরীবালের সঙ্গে মমতা।

আপ্যায়ন। নীতীশ কুমার ও অরবিন্দ কেজরীবালের সঙ্গে মমতা।

সন্দীপন চক্রবর্তী
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০১৬ ০৪:০৩
Share: Save:

রাজ্যপাল এম কে নারায়ণনের অনুরোধে সে দিন চায়ের সঙ্গে কুকিজ তুলে নিয়েছিলেন শুধু। এ বার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নীতীশ কুমার, লালুপ্রসাদ, অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরীবালদের বললেন ভেটকির পাতুরিটা চেখে দেখতে। বাংলার একেবারে নিজস্ব পদ বলে কথা!

Advertisement

সে বার রাজভবনের চেনা চৌহদ্দিতে আটকে ছিল সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। এ বার একই কর্তব্য সমাধা হল রেড রোডের আম দরবারে। চল্লিশ বাই আটচল্লিশ ফুট মঞ্চে। যার পিছনে আবার ১০ হাজার বর্গফুটের হ্যাঙ্গার। যাকে ঠান্ডা রাখতে ভ্যাপসা গরমে অবিরাম কাজ করে গেল ১২০টা এসি মেশিন।

সে বার এ রাজ্যের শিল্প-সংস্কৃতি-বণিক মহল এবং রাজনীতি জগতের পরিচিত নানা মুখকে দেখা গিয়েছিল রাজভবনের সোফায়। এ বার ভিন্ রাজ্যের ভিআইপি-রা মঞ্চের উপরে। নীচে রাস্তায় আমন্ত্রিত অতিথি এবং আরও পিছনে আম দর্শক।

সে বার বিপুল জনাদেশের ধাক্কায় ৩৪ বছরের সরকারকে উল্টে দিয়ে তিনি ছিলেন ঈষৎ সলজ্জ। শপথ পাঠ করছেন, তবু তার মধ্যে যেন ‘কোথায় এলাম’ ভাব! এ বার সে সবের বালাই নেই। যেমন করে রোজ গায়ে সুতির চাদর জড়িয়ে এবং হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে কালীঘাট থেকে বেরিয়ে নবান্নে যান, অবিকল সেই ভঙ্গিতেই রেড রোডে হাজির। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী শপথবাক্য শুরু করিয়ে দেওয়ার পরে দ্বিতীয় পাতায় গিয়ে এক বার ‘শপথ করিতেছি যে’ কথাটা বলতে ভুলে গেলেন ঠিকই। আটকে গিয়ে শুধরে নিলেন। কিন্তু তাতে কোথাও টেনশনের লেশমাত্র নেই!

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুক্রবার বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে দ্বিতীয় বারের জন্য শপথ নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসলে নিয়ন্ত্রণ নিলেন! অনুষ্ঠানের ভাবনা থেকে মন্ত্রিসভা বাছাই, অতিথি আমন্ত্রণ থেকে মঞ্চের পিছনের তাঁবুতে বাঙালি খানায় আপ্যায়ন— এ বার তিনিই কর্ত্রী। আগে তাঁর হাতে কর্তৃত্ব ছিল না, এমন তো নয়। কিন্তু সারদা, নারদা এবং বিরোধী জোটকে ধরাশায়ী করে ২১১ আসন নিয়ে ফেরার পরে এ বারের কর্তৃত্ব আরও কঠোর, আরও অমোঘ! যে জন্য গত বার দফতর বণ্টন করতে যাঁর মধ্যরাত গড়িয়েছিল, এ বার ৪০ মিনিটের বৈঠকেই সে কাজ খতম।

তথ্যের খাতিরে বলা যাক, সাংবিধানিক রীতি মেনে শপথ নিয়েছেন মমতা-সহ ৪২ মন্ত্রী। বাঁধা গতের অনুষ্ঠানে অন্য রকম ছবি বলতে এ বার আর প্রত্যেক মন্ত্রীর আলাদা আলাদা শপথ নয়। মুখ্যমন্ত্রীর পরে পাঁচ জনের মোট ৬টা ব্যাচ, চার জনের দু’টো এবং তিন জনের একটা ব্যাচ— এই ভাবে কম সময়েই মিটিয়ে দেওয়া হল শপথ পাঠের পালা। এক একটা ব্যাচের শপথ শুনতে মন্ত্রোচ্চারণের মতো লাগল। আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা যখন বলছেন ‘আল্লার নামে শপথ করিতেছি’, পাশেই অন্য জন তখনও ‘আমি শ্রী সাধন পাণ্ডে’তে রয়েছেন! কোনও ব্যাচে অরূপ বিশ্বাস, কোনও ব্যাচে শান্তিরাম মাহাতো, কোনও ব্যাচে আবার রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা বাকিদের ছাড়িয়ে ঠিকরে উঠল— এ সবও ঘটল। মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন মন্ত্রীর নাম ডাকতে গিয়ে চূড়ামণি মাহাতোকে ‘শ্রীমতি’ বললেন, তা-ও ঠিক। কিন্তু বড় বড় আসরে এমন ছোটখাটো বিচ্যুতি হয়েই থাকে!

ঢাউস মঞ্চের সামনে সিমেন্ট দিয়ে ইট গাঁথনি করে জাপানিজ রক গার্ডেন, ঘাসের রোল দিয়ে মুড়ে ফেলা চত্বর তৈরি ছিল সেই অনুষ্ঠানের জন্য, যাকে বিরোধীরা বলছেন রাজসূয় যজ্ঞ।

রাস্তা-বোঝাই জনতার অবশ্য আরও কিছু আক্ষেপ ছিল।

একে তো প্রখর রোদে মাথায় কোনও ছাউনি নেই। বিশাল মঞ্চে কে যে এসে বসছেন, কে দাঁড়িয়ে শপথ নিতে যাচ্ছেন, রাস্তায় বসে দূর থেকে কিছুই ঠাওর করার উপায় নেই। রাস্তার ধারে জায়ান্ট স্ক্রিন ছিল ঠিকই। কিন্তু কটকটে রোদে সে স্ক্রিন ব্ল্যাকবোর্ডে কালো অক্ষরের মতো হয়ে থাকল!

অনুষ্ঠান শেষে জলের বোতলের জন্য হা-ক্লান্ত জনতার ঝাঁপিয়ে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তৃষ্ণা তাঁদের মেটেনি। দিদির পাঁচ বছরের জমানা আসলে বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে। খোলা দরবারে তিনি অনুষ্ঠান এনে ফেলেছেন মানে এই বুঝি শাহরুখ খান এসে নেচে দিয়ে যাবেন! এই বুঝি অমিতাভ বচ্চনের ব্যারিটোন শোনা যাবে! কিন্তু এ দিন তো সে সব দিনের মতো নয়!

সবিস্তার পড়তে ক্লিক করুন।

পাঁচ বছর আগে রাজভবন থেকে শপথ নিয়ে বেরিয়ে হাজার জনতার সঙ্গে পা মিলিয়ে মহাকরণ পৌঁছেছিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। মহাকরণের অলিন্দ সে দিন তিলধারণেরও জায়গা রাখেনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের পদ ফিরে পাওয়ার পরে এ দিনও একটু হাঁটলেন মমতা। অনুষ্ঠান শেষে ফোর্ট উইলিয়ামের সামনে তখন ছবি-উৎসুক তরুণদের হাল্কা ভিড়। মমতা গাড়ি থেকে নামলেন। বললেন, ‘‘আপনারাই তো সব। মানুষের জয় এটা। মা-মাটি-মানুষের সরকার। মানুষের জন্যই কাজ করব।’’ একটু পরে আবার ফিরে গেলেন তাঁর ছোট গাড়িতে।

মহাকরণ পৌঁছনোর পায়ে চলা পথ এ বার মোটর-রাস্তা হয়েই নবান্নে পৌঁছে দিল দ্বিতীয় বারের মুখ্যমন্ত্রীকে।

—নিজস্ব চিত্র।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.