Advertisement
E-Paper

চোখ ছলছল মায়ের, আলোর শিশু ছিটকে যায় কোল থেকে

কী অত নকল মন্দিরের খোঁজ করেন স্যার! আমাদের প্যান্ডেলটা একবার তাকিয়ে দেখেছেন? বারো মাসের প্যান্ডেল! হপ্তাখানেকের জন্য বেঘর করেছেন বলে কি ওটা আমাদের নয়? কেমন মাথার ওপর গাড়ি চলে! কী লাইটিং!

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৬ ০৩:৪৪

কী অত নকল মন্দিরের খোঁজ করেন স্যার! আমাদের প্যান্ডেলটা একবার তাকিয়ে দেখেছেন?

বারো মাসের প্যান্ডেল! হপ্তাখানেকের জন্য বেঘর করেছেন বলে কি ওটা আমাদের নয়? কেমন মাথার ওপর গাড়ি চলে! কী লাইটিং!

ভরসন্ধেয় চেনা মুখের কথা শুনে হতভম্ব সাদা উর্দিধারী। গড়িয়াহাট উড়ালপুলের নীচে ট্রাফিক গার্ডের গুমটির ধারে আকছার মোলাকাত। মেয়েটার চোখেমুখে কথা। ডিউটির ফাঁকে কোনও দিন সন্ধেরাতে দেখা হলে, ‘আসুন স্যার’ বলে নীল-সাদা চেয়ার এগিয়ে দেবে! যেন ড্রয়িংরুম। বলে, কোন হকার নাকি দিয়েছে।

ড্রয়িংরুমের পাশেই ওপেন কিচেন। ক’টা ইটের ফাঁকে একটু কাঠ গুঁজে আগুন। নীতা বলে, একটু চা বসাই, স্যার! ভাল কাপ আছে! পুজোর পর ভাবছি একটা ইস্টোভ কিনব!

আপাতত সেই চা অবশ্য শিকেয় তোলা। শুধু প্যান্ডেলটাই যা আছে! ভোজবাজির মতো ‘ভ্যানিশ’ গোটা সংসার। হাঁড়িকুড়ি, শিলনোড়া কাছের গলিতে লতা-আরিফাদের জিম্মায়। লক্ষ্মীঠাকুরের জরির পাড় উল্টো ফুটে হকারের ডালায়। পুজো উপলক্ষে তিনিও নির্বাসিত। শহরের মুখ প্রসাধনে চাপা পড়েছে। উড়ালপুলের তলা ঝকঝকে। বছরভর ওখানেই মাথা গোঁজা, খিটিমিটি গেরস্থালি শ’দেড়েক প্রাণীর। প্রদীপের কালি ঘষেমেজে এখন সাফসুতরো।

তাতে কী? ওটা আমাদেরই ঘর!

মেয়েটার কথা শুনে তাজ্জব দারোগাবাবু। সত্যি তো নীতাদের ‘প্যান্ডেল’টা হ্যালোজেনের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। এক ধারে গুজরাতের অম্বাজি মন্দির তো অন্য দিকে দক্ষিণের মীনাক্ষী মন্দির। উড়ালপুলের নীচের পার্কিং লট সরে গিয়ে জনারণ্য। সাইডে তাঁবু খাটিয়ে পুলিশক্যাম্প। নীতা কান এঁটো করে হাসে, ‘‘সব আমাদের মেহমান স্যার! এত লোক কখনও দেখেছেন আপনার বাড়িতে?

এত ফুর্তি পায় কোথা থেকে কে জানে! এমনিতে দুগ্‌গার থেকে মা শেতলা, আর কালীঘাটের বাবা মহাকালই বেশি প্রিয় নীতার। নতুন শাড়ি, সায়া সব শীতলা মায়ের পুজোয় কেনা হয়। তার পরে রাস্তায় শুয়ে দণ্ডি কাটা। তবু দুগ্‌গা পুজোই আসল রোজগারের সময়। মায়ের কৃপায় গড়িয়াহাট চত্বরে অভাব নেই প্লাস্টিকের। কুশন কভার থেকে ক্যারিব্যাগের ছড়াছড়ি। মহালয়ার সকাল অবধি সব কুড়িয়ে গোলপার্কে বেচেবুচে দিয়ে এসেছে নীতা। পুজোয় উদ্বাস্তু দশাতেও তার মরার সময় নেই।

সিংহী পার্কের দিকের ফুটে জলজিরার ঠেক। পুরনো শাড়িটা কোমরে গুঁজে ড্রামে মগ চুবিয়ে ফটাফট গেলাস সাজিয়ে দিচ্ছে মাঝরাত্তিরে। সঙ্গে দ্বিতীয় স্বামী স্বপন। টিউবওয়েলের জল রুমাল দিয়ে ঝেঁকে স্যাকারিন, মশলা মেশানো। নীতা বলে, ভাবছেন কী? আমাদের একটা দায়িত্ব আছে! টিউকলের জল হলেও পেট খারাপ হবে না, গ্যারান্টি!

তোর ছেলেটাকে আনলি না হস্টেল থেকে? বড়টা, মানে সুনীলই বা গেল কই!

সুনীল টালিগঞ্জে স্যার। চাইনিজের কাজ শিখছে! পিন্টুকে আনার সাহস হল না। আপনি সব জানেন, আবার যদি ওদের পাল্লায় পড়ে? কালীঘাটের শ্মশান না লেক কোথায় যাবে! পেলাস্টিকে মুখ ঢুকিয়ে ডেনড্রাইটে ফুঁ দিয়ে নেশা করে পড়ে থাকবে!

কোলেরটা, দু’বছরের সুজয়, এসে পা জড়িয়ে ধরেছে। মায়ের ঠেলায় আদুড় গায়ে রাস্তায় লুটিয়ে ছেলে ‘ভ্যাঁ’। ‘‘ওকে হয়তো আরও ক’টা বছর কাছে রাখতে পারব স্যার! মাঝের দু’টোর একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন পুজোর পরে?’’

চম্পা চার বছরের। গোপাল দশ। কাছের গলিতে পুজোয় বাইক ‘পার্কিং’ করে। বাইকপিছু ১০ টাকা। বাচ্চাগুলো সব থানার নবদিশা স্কুলে যায়। শিপ্রাটাও যেত। চম্পার উপরের বোন। সে এখন কসবার হস্টেলে। পিন্টুটা অনেক দূর, রাজারহাট! মায়ের চোখ ছলছল করে।

‘ও আমার জ্ঞানদা বাচ্চা ছিল স্যার! কী বুদ্ধি!’ বছর তিনেক আগে উড়ালপুলের উপরে দুর্ঘটনায় মাথায় মারাত্মক চোট পেয়েছিল। শিশুমঙ্গলে ডাক্তাররা বলেছিল, যাও মানতটানত করো! সেই ছেলে কিন্তু উঠে বসেছিল। পুত্রগর্বে গলা ধরে আসে মায়ের। হাসপাতালের সুপারহিট বাচ্চা ছিল একদম! ডাক্তারবাবুদের বলেছিল, ‘পড়াশোনা শিখতে পারলে আমরাও ডাক্তার হতাম।’ কিন্তু ঘরে রাখা

গেল না! ডেন়়ড্রাইটের খপ্পর থেকে বাঁচাতে পাড়ার এক বাবুই হস্টেল ঠিক করে দেন।

পথের জীবন হাড়ে-হাড়ে চেনা নীতার। ‘‘আমার বাচ্চাগুলো তো তাও হাজরায় হাসপাতালে জন্মেছে। মা আমায় বালিগঞ্জের রাস্তায় জন্ম দিয়েছিল।’’ ছোটবেলায় সেই মায়ের কাছে শোনা কথাগুলোই বারবার মেয়ের সামনে আওড়ায় নীতা। শোন, কেউ কিছু খেতে দেবে বলে ডাকলে খবরদার যাবি না! বলবি, এখানে সবার সামনে দাও! থানায় মেয়ের ইস্কুলেই আলোচনা হচ্ছে, ব্রেবোর্ন রোডের ঘটনা! ‘‘ও স্যার, ওই মেয়েটাও কি আমার চম্পার মতো ছিল? ওরা কি এখনও ঘুমোয় ফুটপাথে?’’

গোপাল আসে! ‘‘আমি আর বোন কি এক হস্টেলে যাব, না আলাদা?’’ ছেলেমেয়েকে কাছে টেনে পুলিশের দিকে তাকায় মা, ‘‘ও স্যার, পুজোর পর দিন না একটা ব্যবস্থা করে! ভাল থাকবে ওখানেই!’’

বাচ্চাগুলো এ রাতে কেমন আলোর শিশু হয়ে ওঠে। তাদের গায়ে ধুলো-মাখা দুর্গার হাত।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy