রাজারহাট চৌমাথা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে সাইকেল। আরোহী নবম শ্রেণির দুই পড়ুয়া। স্কুল থেকে বাড়ি প্রায় তিন কিলোমিটার পথ। এত দিন এতটা পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হত। নবম শ্রেণিতে উঠতেই স্কুল থেকে ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের সাইকেল মিলেছে। তাতে স্কুলে যাতায়াতের সুবিধা হয়েছে, জানাল তারা।
সরকারি স্কুলে ভর্তি হলেই পড়ুয়ারা পায় নানা ধরনের প্রকল্পের সুবিধা। বিকাশ ভবনের কর্তারা জানাচ্ছেন, নবম শ্রেণিতে ‘সবুজ সাথী’-র সাইকেল, একাদশ শ্রেণিতে ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পে ট্যাব কেনার জন্য পড়ুয়াদের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার করে টাকা, ছাত্রীর ১৮ বছর বয়স হলে এবং তখনও তাঁর বিয়ে না হলে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২৫ হাজার টাকা মেলে। অসচ্ছল মেধাবী পড়ুয়াদের জন্য রয়েছে ‘স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট অ্যান্ড মিনস স্কলারশিপ’। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের জন্য আছে ‘ঐক্যশ্রী’, তফসিলি জাতি-জনজাতিদের জন্য ‘শিক্ষাশ্রী’ প্রকল্প।
শিক্ষকদের যদিও প্রশ্ন, স্কুলগুলোকে আইসিইউ-তে পাঠিয়ে পড়ুয়াদের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দিলে আখেরে তাদের লাভ হয় কি? যেখানে গিয়ে তারা পড়বে, সেই স্কুলগুলোর তো নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। শিক্ষকদের আক্ষেপ, পড়ুয়াদের জন্য প্রকল্পে যত বরাদ্দ হয়, তার ছিটেফোঁটা পেলেও স্কুলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারত।
অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বললেন, ‘‘প্রতিটি পড়ুয়া যেন প্রকল্পের টাকা পায়, প্রধান শিক্ষকদের বারবার তা নিশ্চিত করতে বলে বিকাশ ভবন। অথচ স্কুল চালানোর প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিকাঠামোর জন্য খরচের ছিটেফোঁটাও মেলে না। স্কুলের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা হয়।” মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা অনিমেষ হালদারের কথায়, ‘‘স্কুলগুলো যেন রেশনের দোকান। পড়ুয়ারা শুধু প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে। স্কুল কী ভাবে চলবে, সেই দিকে শিক্ষা দফতরের নজর নেই।’’
শিক্ষার অধিকার আইনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনা নিশ্চিত। প্রধান শিক্ষকেরা বলছেন, ২০১১ সাল থেকে শিক্ষা দফতর জানিয়ে দিয়েছে, স্কুলে পড়ুয়াদের কাছ থেকে বার্ষিক বেতন ২৪০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাসিক বেতন ২০ টাকা। প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়াদের পড়াশোনা পুরোটাই বিনামূল্যে।
বোঝাই যাচ্ছে, বেতন থেকে আয় নামমাত্র। এখন দেখা যাক, স্কুল চালাতে আবশ্যিক খরচ কেমন। শিক্ষক-শিক্ষিকারা জানাচ্ছেন, স্কুল চালানোর জন্য চক-ডাস্টার, হাজিরা খাতা কেনার খরচের পাশাপাশি রয়েছে রক্ষী রাখা, বিদ্যুতের বিল, তিনটি পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তরপত্র তৈরি, স্কুলের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সর্বোপরি স্কুলের নিয়োগ করা আংশিক সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের রাখার খরচ। শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, এর জন্যই ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ চালু হয়েছিল। দৈনন্দিন খরচ এবং স্কুলে সাধারণ মেরামতির খরচ চালাতে কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ বরাদ্দের ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ পাওয়ার কথা স্কুল কর্তৃপক্ষের। সেই টাকা কি নিয়মিত মেলে?
স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা এক হাজার বা তার বেশি হলে ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ বাবদ পাওয়া যাবে বছরে এক লক্ষ টাকা। ৭৫০ থেকে ৯৯৯ জন পড়ুয়া হলে মিলবে ৭৫ হাজার টাকা, ৭৪৯ থেকে ৫০০ জন পড়ুয়া হলে ৫০ হাজার টাকা, ২৫০ থেকে ৪৯৯ জন পড়ুয়া হলে ২৫ হাজার টাকা। পড়ুয়া ২৫০ জনের কম হলে পাওয়া যাবে ১০ হাজার টাকা। শিক্ষকদের মতে, এই টাকাও নিয়মিত পুরো পাওয়া গেলে স্কুল চালাতে সমস্যা হত না। কিন্তু কোভিড অতিমারির পর থেকে এই ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’-এর টাকাও অনিয়মিত। অধিকাংশ প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, চলতি বছরে স্কুলগুলো ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ বাবদ টাকা পেয়েছে তাদের পড়ুয়ার সংখ্যার নিরিখে প্রাপ্য বরাদ্দের মাত্র ২৫ শতাংশ।
শিক্ষক নেতা তথা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নবকুমার কর্মকারের কথায়, “২০১৬ সালের পরে শিক্ষক নিয়োগ নেই। ২০১৬ সালে যে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল, সেই প্যানেল পুরোপুরি বাতিল হয়েছে। শিক্ষকের এই তীব্র সঙ্কটে প্রায় প্রতিটি স্কুলকে আংশিক সময়ের শিক্ষক রাখতে হয়েছে। এই আংশিক সময়ের শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি স্কুলগুলোর নেই। তবু কিছু কিছু স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেরা চাঁদা তুলে আংশিক সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন দিচ্ছেন। কিন্তু এই পরিস্থিতি কত দিন চলবে?” শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী বলেন, ‘‘শিক্ষা দফতর তো বলছে, বছরের শুরুতে ‘বই দিবস’ থেকে শুরু করে বৃক্ষরোপণ, নবীন বরণের মতো ‘স্টুডেন্ট’স উইক’-এর নানা অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবস এবং আরও বিভিন্ন পালনীয় দিবস স্কুলে পালন করতে হবে। কিন্তু এই সব দিবস পালন করতে গেলে যে টাকা লাগে, সেটুকুও অনেক সময়ে স্কুলের তহবিলে থাকে না। শিক্ষকদেরই চাঁদা তুলে এই সব দিবস পালন করতে হয়।’’
শিক্ষা দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, সর্বশিক্ষা মিশন থেকে ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ পাওয়া যায়। এর ৫০ শতাংশ দেওয়ার কথা রাজ্যের, ৫০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্র তার ভাগের টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে দিচ্ছে না। কেন্দ্র কেন নিজের অংশের টাকা দিচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে কেন্দ্র-রাজ্যের সংঘাতের গল্প। কী সেই সংঘাত?
(চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)