ভোটের আগে ‘টাকার খেলা’ এবং অর্থের বিনিময়ে ‘বেচা-কেনা’ নিয়ে দলকে সতর্ক করলেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার ধর্মতলার ধর্না কর্মসূচি আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ করার সময়ে বক্তৃতা করেন মমতা। সেখানে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা শাসকদলের অন্দরে তো বটেই, রাজনৈতিক মহলেও কৌতূহলের উদ্রেক ঘটিয়েছে।
বক্তৃতার প্রায় শেষ পর্বে মমতা বলেন, ‘‘নজর রাখতে হবে। কখনও কখনও কাউকে কাউকে টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মনে রাখবেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, ‘টাকা মাটি-মাটি টাকা’। টাকা আসে আবার চলে যায়।’’ এর পরেই মমতা বলেন, ‘‘কিন্তু লোকে যখন জেনে যায়, এই লোকটা টাকা নিয়েছে, তখন সেটা চাপা থাকে না। তাতে চিরকাল মানুষের কাছে গদ্দার হয়ে পরিচিত থাকতে হয়। কেন এই বদনাম নেবেন? আপনারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচুন।’’ সেখানেই থামেননি তৃণমূলনেত্রী। তিনি বলেন, ‘‘আমাদেরও যদি কাউকে কেনার চেষ্টা করে, আমরা কিন্তু নজর রাখব। সেটা সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।’’
কাকে কেনার চেষ্টা হয়েছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি মুখ্যমন্ত্রী। তবে শাসকদলের সর্বোচ্চ নেত্রীর এই বক্তব্য যে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আনুষ্ঠানিক ভাবে শাসকদলের কেউ এ নিয়ে মন্তব্য করেননি। তবে তৃণমূল নেতাদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আলোচনায় নানাবিধ ব্যাখ্যা উঠে আসছে। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, মমতা যে ভাবে মঙ্গলবার মন্তব্য করেছেন, তাতে ‘আশঙ্কার সুর’ রয়েছে। আবার অনেকের বক্তব্য, ভোটের আগে মমতা দলকে বোঝাতে চাইলেন, তাঁর নজর সব দিকে রয়েছে। এমনটা তিনি করেই থাকেন। ফলে এই বিষয়টি নতুন নয়।
আরও পড়ুন:
কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছে মমতার ‘কখনও কখনও কাউকে কাউকে টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে’ মন্তব্যে। কোনও নির্দিষ্ট নেতা সম্পর্কে কি তাঁর কাছে কোনও ‘খবর’ রয়েছে? শাসকদলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘দলের মধ্যে এই আলোচনা রয়েছে যে, যাঁরা বিধানসভায় টিকিট পাবেন না, তাঁদের কেউ কেউ ভিন্ন পথ ধরতে পারেন। সে কথা মাথায় রেখেই মমতা ওই কথা বলে থাকতে পারেন।’’
১৫ বছরের স্থিতাবস্থা বিরোধিতা নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে যেতে হচ্ছে তৃণমূলকে। শাসকদলের অন্দরে বেশ কয়েক মাস ধরেই গুঞ্জন, গত বার জেতা বেশ কিছু বিধায়ক এ বার টিকিট পাবেন না। বাদ পড়তে পারেন একাধিক মন্ত্রীও। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক জন মন্ত্রী দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো শুরু করে দিয়েছেন। দক্ষিণবঙ্গের এক মন্ত্রীকে ধর্মতলায় পাঁচ দিনের ধর্নায় এক দিনও দেখা যায়নি। তাঁর শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, এমন খবরও নেই। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, জেলায় জেলায় এমন আরও বেশ কিছু নেতা দলের আতশকাচের নীচে রয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশেই মমতা ধর্নাশেষের বক্তৃতায় ওই মন্তব্য করে থাকতে পারেন বলে অভিমত অনেকের।
আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় রোজই দাবি করছেন, এ বারের ভোটে গত বারের তুলনায় তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুই’ই বাড়বে। লোকসভা ভোটের আগেও একই দাবি করেছিলেন অভিষেক। তা মিলেও গিয়েছিল। কিন্তু বিধানসভা ভোটের আগে যে পরিস্থিতির গুণগত বদল ঘটেছে, তা-ও মানছেন তৃণমূলের অনেকে। ফলে ভোটের আগে ‘সেনাপতি’ হিসাবে অভিষেককে এ কথা বলতেই হবে। কিন্তু শাসকদলের মধ্যে এ-ই আলোচনাও রয়েছে যে, আসন যদি দু’শোর থেকে কিছুটা কমে যায়, তখন পশ্চিমবঙ্গে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে। কারণ, জাদুসংখ্যার খানিক আগে থেমে গেলে বিজেপি যে সরকার গঠনের মরিয়া চেষ্টা করবে, সে বিষয়ে সকলেই ওয়াকিবহাল। সেই আশঙ্কার বিষয়টি টেনে এনেও মমতার মঙ্গলবারের বক্তব্য ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করতে চাইছেন অনেকে।