ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে শাসকদল তৃণমূল আর নির্বাচন কমিশনের বিবাদ বেড়েই চলেছে। এ বার ভোটার তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ যথাযথ ভাবে কার্যকর করার দাবিতে নির্বাচন কমিশনকে কড়া চিঠি দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-এর দফতর।
শুক্রবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে একাধিক বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। এক কথায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কমিশন মানছে না বলেই চিঠিতে উল্লেখ করেছেন অভিষেক। তাঁর চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য প্রকাশিত ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে, যা দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন।
ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য ২০২৬ সালের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী চূড়ান্ত তালিকার পাশাপাশি প্রতি দিনের ভিত্তিতে পরিপূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল। অভিষেকের অভিযোগ, সেই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ বা ঘোষণা করা হয়নি। ফলে পরিপূরক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভোটারেরা চূড়ান্ত তালিকার অংশ হিসেবে গণ্য হবেন কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির ভিত্তিতে প্রস্তুত হওয়া পরিপূরক ভোটার তালিকা প্রতি দিন প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ ভোটার এবং রাজনৈতিক দলগুলি পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রতি দিন সেই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। এর ফলে দাবি-আপত্তির নিষ্পত্তি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না এবং সাধারণ মানুষও জানতে পারছেন না কোন আবেদনের কী সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অভিষেকের তরফে দাবি করা হয়েছে, বিচারকদের জন্য একটি বিশেষ পোর্টাল তৈরি করা হলেও সেখানে আপলোড হওয়া তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য ভোটার বা রাজনৈতিক দলগুলির কাছে পৌঁছোচ্ছে না। তৃণমূলের মতে, এতে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। চিঠিতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিষেকের বক্তব্য, যে সব ক্ষেত্রে কোনও ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন খারিজ করা হয়েছে বা নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কারণ জানানো প্রয়োজন। এতে সংশ্লিষ্ট ভোটারেরা প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন এবং পুরো প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে।
ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে স্পষ্ট নির্দেশ জারি করে জানাতে হবে যে প্রতি দিন প্রকাশিত পরিপূরক ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভোটারেরা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকার অংশ হিসেবে গণ্য হবেন। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে প্রতি দিন পরিপূরক তালিকা প্রকাশ এবং দাবি-আপত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আনার দাবিও জানানো হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, ভোটার তালিকা প্রস্তুতির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং ভোটাধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ করে, সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। কারণ, এসআইআর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুক্রবার থেকেই ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে ধর্না শুরু করেছেন। সেই ধর্না অবস্থানে বক্তৃতা করতে গিয়ে কড়া ভাষায় নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করেছেন অভিষেক। সেই আক্রমণাত্মক বক্তৃতার পরেই এই কড়া চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে।
আরও পড়ুন:
সিইও অফিসের বক্তব্য, ফর্ম-৭-এর মাধ্যমে ভোটার বাদ যাওয়ার যে সংখ্যা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অটো জেনারেটেড ফর্ম-৭-ও রয়েছে। এই অটো জেনারেটেড ফর্ম-৭ তৈরি হয় যখন এনুমারেশন ফর্ম যাচাই করে দেখা গিয়েছে যে, ওই ব্যক্তি চূড়ান্ত রোলের জন্য যোগ্য নন। কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে তথ্য পাঠানো হয়েছে, তাতে ৫,৩৮,৩২০টি এমন ডিলিশন বা বাদ যাওয়া দেখানো হয়েছে। এর বাইরে সাধারণ ভাবে ফর্ম-৭ আবেদন করে ভোটার বাদ দেওয়ার সংখ্যা রাজ্যে মাত্র ৭,৭৩৩।