পাঁচটি বুথে পেয়েছেন একটি করে ভোট! সাতটি বুথে পেয়েছেন দু’টি করে! প্রচারের শেষ দিনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করা ফলতার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী, স্বঘোষিত ‘পুষ্পা’, জাহাঙ্গির খান ঠিক কতটা ঝুঁকেছেন, তা বুথভিত্তিক ফলে চোখ রাখলেই ধরা পড়ছে।
ফলাফল বলছে, যে সব বুথে তৃণমূল দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়েছিল, সেই সব জায়গায় এ বার তাদের প্রাপ্ত ভোট দশেরও কম। তবে কোনও বুথে শূন্য না-পাওয়ায় তৃণমূলের ‘মুখরক্ষা’ রয়েছে বলে কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা! বুথভিত্তিক ফল বলছে, বহু বুথে তৃণমূলের ঝুলিতে পড়া ভোটের সংখ্যা ১,২,৩,৪,৫ বা ৬।
ফলতায় গত বার তৃণমূলের প্রার্থী এক লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এ বার সেখানে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের প্রাপ্ত ভোট ৭৭৮৩। পেয়েছেন ৩.৭% ভোট। বুথভিত্তিক ফল বলছে, কোনও একটি বুথে তাঁর পাওয়া সর্বাধিক ভোট হল ২৪৬। ওই একটি বুথেই (৩০ নম্বর) তিনি দু’শোর গণ্ডি পেরিয়েছেন। একশো থেকে দু’শোটি ভোট পেয়েছেন মাত্র দু’টি বুথে। এক থেকে পাঁচটি ভোট পেয়েছেন প্রায় ৫০টি বুথে। আবার ৬০-এর চেয়ে একটু কম বুথে পেয়েছেন ৬ থেকে ১০টি ভোট। তেমনই ১১-২০টি ভোট পেয়েছেন ৬৫টিরও কম বুথে। আবার ২১-৩০ ভোট পেয়েছেন কম-বেশি ৪০টি বুথে। ৩১-৪০ ভোট পেয়েছেন ৩০টিরও কম বুথে। দশটির কিছু বেশি বুথে পেয়েছেন ৪১-৫০ ভোট। জাহাঙ্গিরের প্রাপ্ত ভোট ৫১-১০০ হয়েছে ২০টিরও কম বুথে। কেবল পোস্টাল ব্যালটের ভোটে তৃণমূলের (১৫২৬) থেকে পিছিয়ে বিজেপি (২৪৫) ও সিপিএম (২০)। পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণ হয়েছিল ২৯ এপ্রিলের আগে। তখন জাহাঙ্গিরের দাপট পূর্ণ মাত্রায় বজায় ছিল, বলছে বিরোধীরা।
সদ্যপরাস্ত শাসক দলের প্রার্থীর নিজের বুথেও ফলাফল শোচনীয়। জাহাঙ্গির ফলতা কেন্দ্রের শ্রীরামপুর খানপাড়ার ১৯০ নম্বর বুথের ভোটার। সেখানে মোট ভোটার ৯৮৬। জাহাঙ্গির পেয়েছেন ১৩৭টি ভোট! বিজেপি পেয়েছে ৪৫২টি ভোট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিপিএমের ঝুলিতে গিয়েছে ৩২৮টি ভোট।
দলের সঙ্গে কথা না-বলে নিজেকে ভোট থেকে সরিয়ে নেওয়ায় জাহাঙ্গিরের সমালোচনা শুরু হয়েছে তৃণমূলে। রাজ্যের এক শীর্ষ তৃণমূল নেতার কথায়, ‘‘ফলাফলে আমাদের মুখ পুড়েছে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। আমাদের ধারণা, নির্বাচন থেকে জাহাঙ্গির নিজেকে সরিয়ে না-নিলে সিপিএম ও কংগ্রেসের পাওয়া ভোটের প্রায় সবটাই আমাদের ঝুলিতে আসত। আমরা আসরে না-থাকায় সিপিএম দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। জাহাঙ্গিরের ভুলে গোটা রাজ্যে আমাদের দল সম্পর্কে ভুল বার্তা গেল!’’ অন্য দলের নেতারা অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রচারের শেষ দিনে জাহাঙ্গির মৌখিক ভাবে সরে দাঁড়ালেও ইভিএমে তৃণমূল প্রার্থীর নাম ও প্রতীক ছিল। ফলে, তৃণমূল প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ ফলতার ভোটারদের কাছে ছিল।
একই সঙ্গে তৃণমূলের ওই নেতার দাবি, ‘‘বিজেপি প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোটে জয়ে গণনা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। রাজ্যের পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ফলতায় দেড় লক্ষ ভোট পাওয়ার মতো জায়গায় বিজেপি নেই।’’
বিজেপিও মানছে, ফলতায় দেড় লক্ষ ভোট পাওয়ার মতো সংগঠন তাদের নেই। দলের এক নেতার মতে, ‘‘মহিলারাই প্রথম ফলতায় তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। মহিলারা ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে। তার সঙ্গে হিন্দু ভোটের চূড়ান্ত মেরুকরণ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শেষ মুহূর্তে ফলতায় সভা করায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছি আমরা।’’ এক সিপিএম নেতার দাবি, ফলতার নির্বাচন রাজ্য রাজনীতির নতুন ভাষ্য তৈরি করেছে। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যের ২৯৩ কেন্দ্রের ফলপ্রকাশের পরে সেখানে প্রচারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সময় বেশি পেলে ফল আরও ভাল হত। সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মির মতে, ‘‘বিকল্প শক্তি হিসেবে মানুষ আমাদের মেনে নিয়েছেন। এত দিন জাহাঙ্গিরের ভয়ে মানুষ আমাদের ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু এ বার আমাদের ভোটাদাতারা ফিরে আসছেন। আগামী দিনে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।’’
ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকে জাহাঙ্গিরকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর স্ত্রী রেজিনা বিবি ভোট দিতে গেলেও পুনর্নির্বাচনের দিন অন্তরালে ছিলেন তিনি। তার পরেও জাহাঙ্গিরের ফোন বন্ধ, মোবাইল-বার্তার উত্তর মেলেনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)