Advertisement
১৪ জুলাই ২০২৪

১৬-০ হচ্ছেই, হাসছেন কেষ্ট

বিজেপি, বাম-কংগ্রেস নেতৃত্বের অভিযোগ, পুলিশের সামনে ইভিএম লুটের চেষ্টা, বুথে ঢুকে ছাপ্পা ভোট হয়েছে। রয়েছে বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও।

রবিবার নলহাটির ভোটের পরে আত্মবিশ্বাসী অনুব্রত মণ্ডল।

রবিবার নলহাটির ভোটের পরে আত্মবিশ্বাসী অনুব্রত মণ্ডল।

নিজস্ব প্রতিবেদন
শেষ আপডেট: ১৪ অগস্ট ২০১৭ ০১:৩১
Share: Save:

ভোট-প্রচারে এসে জেলা তৃণমূলের পর্যবেক্ষক ফিরহাদ হাকিম বলেছিলেন, ‘‘অনুব্রতর জন্যেই জিতব’’। ভোটের ফল কী হবে, তার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে আরও দু’টো দিন। কিন্তু, রবিবার নলহাটির ভোটের পরে জেলা তৃণমূল নেতাদের অনেকেই আত্মবিশ্বাসী। জেলা তৃণমূলের সভাপতি অনুব্রত (কেষ্ট) মণ্ডল বলেন, ‘‘নলহাটির পুরভোট খুব ভাল হয়েছে। কোনও ঝামেলা নেই। ১৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই আমরা জিতব।’’ বিরোধীরা অবশ্য এক যোগে অভিযোগ করছেন, পুরভোটে ব্যাপক কারচুপি করেছে শাসকদল। রাখিবাহিনী নিয়েও সরব হয়েছেন তাঁরা।

বিজেপি, বাম-কংগ্রেস নেতৃত্বের অভিযোগ, পুলিশের সামনে ইভিএম লুটের চেষ্টা, বুথে ঢুকে ছাপ্পা ভোট হয়েছে। রয়েছে বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও। মুরারই থানার এক পুলিশ কর্তাকেও মারধর করে বের করে দেওয়া, কর্তব্যরত চিত্র সাংবাদিকের ক্যামেরা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ‘‘ওই চিত্র সাংবাদিককে মারধরও করা হয়েছে।’’

ভোটের রিটার্নিং অফিসার, মহকুমাশাসক সুপ্রিয় দাস অবশ্য বলেন, ‘‘দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোট নির্বিঘ্নে হয়েছে। ভোট পড়েছে ৮৭.৬ শতাংশ।’’ পুলিশের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ মানেননি জেলার পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীর কুমার। জেলা কংগ্রেসের সভাপতি সৈয়দ মহম্মদ জিম্মি বলেন, ‘‘২, ৫, ১১ এবং ১২ নম্বর ওয়ার্ডে পুননির্বাচনের দাবি জানিয়েছি।’’

১, ২, ৫, ৬, ১১, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডেও বুথ দখলের অভিযোগ উঠেছে। তবে সবথেকে বেশি অশান্তি হয়েছে ১২ নম্বর ওয়ার্ডে। রবিবার দুপুর বারোটা নাগাদ মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নলহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২/২৬ নম্বর বুথে এসে দেখা যায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে এতক্ষণ যাঁরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, বিশেষ করে মহিলা ভোটাররা স্কুল ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বললেন, ‘‘মারপিট চলছে। তাই ভোট না দিয়েই পালিয়ে যাচ্ছি।’’ বুথের ভিতর ভোটকর্মীরা তখন অসহায়। প্রিসাইডিং অফিসার সর্বেশ্বর মণ্ডল জানালেন, ‘‘কয়েক জন বুথে ঢুকে থার্ড পোলিং অফিসারকে ধাক্কা মেরে ইভিএম নিয়ে পালিয়েছে।’’ থার্ড পোলিং অফিসার মানিক মণ্ডল জানান, দশ বারো জন বুথের ভিতরে ঢুকে ভোট দান করার স্লিপ চায়। তাঁদের কাছে সচিত্র পরিচয় দেখতে চাইলে ইভিএম নিয়ে চলে যায়। বুথ থেকে বেরিয়ে দেখা যায় দু’জন মহিলা ভোটার ইভিএম নিয়ে বুথের দিকে আসছেন। অভিযোগ, তাঁদের হাতে ইভিএম রেখে পালায় বহিরাগতেরা।

বুথে চলছে তাণ্ডব, দোতলা থেকে দেখছেন জেলা প্রশাসনের কর্তারা। রবিবার নলহাটি পুরভোটে। ছবি: সব্যসাচী ইসলাম

নির্দল প্রার্থীর লখু শেখের নির্বাচনী এজেন্ট পারভেজ আলম এবং কংগ্রেস প্রার্থী আয়েষা সিদ্দিকা জানান, ইভিএম নিতে যাঁরা ঢুকেছিল, তাঁদের হাতে আকাশি রংয়ের রাখি ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটাররা ওদের তাড়া করলে ইভিএম দু’জন মহিলা ভোটারের হাতে রেখে বেপাত্তা হয়ে যায়। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ইভিএম বুথে ফিরে আসার পরে পৌনে তিনটে নাগাদ আবার ভোট শুরু হয়। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ইভিএম লুটের চেষ্টায় ইভিএমের ইউনিট কন্ট্রোল খারাপ হয়ে যায়। ওই সময় বুথে ৫৩১ ভোট পড়েছিল। এ দিকে, ভোট শুরু হতেই আবার ভোট কেন্দ্রে মারামারি শুরু হয়। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল প্রার্থী একরামুল হক অবশ্য দাবি করেছেন, নির্দল প্রার্থীর লোকজন ওই ইভিএম চুরি করেছে। সে অভিযোগ, হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ওই নির্দল প্রার্থী।

বিকেল চারটে কুড়ি নাগাদ ওই একই বুথের লাইনে দাঁড়ানো দেড়শো ভোটারকে সরিয়ে টিপ টিপ করে পড়তে থাকা বৃষ্টি মাথায় গামছা মুখে বুথের ভিতর ঢুকে যায় কিছু লোক। ভোটারদের ভয় দেখালে তারা সরে যায়। অভিযোগ, এরপরেই বুথের দরজা বন্ধ করে দেয় বহিরাগতেরা। সেই সময় কাছাকাছি ছিলেন নলহাটি ১ ব্লকের বিডিও কিংশুক রায়, সেক্টর অফিসার অভিষেক সান্যালরা। তাঁরা বলেন, ‘‘সব কথা পুলিশকে বলছি। পুলিশ কিছু না করলে আমরা কী করব।’’ জানা গিয়েছে, ওই ঘটনার দশ মিনিট আগে নলহাটি থানার ওসি মহম্মদ আলি, নানুরের ওসি তাপাই বিশ্বাস, মুরারই থানার সিআই অর্ণব গুহ বুথ থেকে চলে যান।

বিরোধীদের অভিযোগ, পুলিশ-প্রশাসনের একাংশ, শাসকদলে মিলে যেন কোনও প্রকারে ১২ নম্বর ওয়ার্ড দখল করতে মরিয়া ছিল। বাম-কংগ্রেস, বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, পুলিশকে কব্জা করে বুথ জ্যাম করে, বহু মানুষকে নিজের ভোট দিতে না দিয়ে হার হতে পারে এমন কিছু ওয়ার্ডে কার্যত জয় নিশ্চিত হয়েছে রাখি-বাহিনীর দাপটেই। নাম না প্রকাশের শর্তে জেলা তৃণমূলের এক নেতাও মানছেন, ‘‘সব ক’টা ওয়ার্ড বের করতে খুব চাপ ছিল দাদা। তাই একটু কৌশলী হতে হয়েছে।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE