Advertisement
E-Paper

এই প্রথম মমতাকে লড়তে হবে সংখ্যালঘু ভোট ভাগের একাধিক সমীকরণের বিরুদ্ধে, ‘পুঁজি’ অটুট রাখাই তৃণমূলের প্রধান চ্যালেঞ্জ

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোট মমতার দিকেই। কিন্তু এই বারই প্রথম নির্বাচন, যেখানে তৃণমূলের সামনে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার একাধিক উপকরণ আবির্ভূত হয়েছে।

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
TMC main challenge in 2026 assembly elections is to prevent division of minority votes

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? আপাতদৃষ্টিতে অবশ্যই ‘আগ্রাসী’ বিজেপি। কিন্তু ভোট, জনবিন্যাস এবং রাজনৈতিক ঘটনা পরম্পরা সম্পর্কে শাসকদলের অবহিত নেতারা একান্ত আলোচনায় স্পষ্টই বলে দিচ্ছেন, এ বারের ভোটে তৃণমূলের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ ‘পুঁজি’ অটুট রাখা। অর্থাৎ, সংখ্যালঘু ভোট যাতে এককাট্টা থাকে, তা সুনিশ্চিত করা। না হলে আসনওয়াড়ি অনেক হিসাব গোলমাল হয়ে যেতে পারে।

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোট মমতার দিকেই। কিন্তু এই বারই প্রথম নির্বাচন, যেখানে তৃণমূলের সামনে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার একাধিক উপকরণ আবির্ভূত হয়েছে।

প্রথম উপকরণ: ২০২১ সালের ভোটের আগে আব্বাস সিদ্দিকি এবং নওশাদ সিদ্দিকিদের আইএসএফ ছিল সদ্য গজিয়ে ওঠা দল। সেই আইএসএফ গত পাঁচ বছর ধরে রাজনৈতিক ভাবে অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে। আব্বাস রাজনৈতিক পরিসর থেকে দূরে থাকলেও তাঁর ‘ভাইজান’ নওশাদ ‘নেতা’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ধর্মের কথা বাদ দিয়ে সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসীদের অধিকারের কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজনীতি করেছেন নওশাদ। শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কোনও মোচড় না-হলে নওশাদেরা এ বারের ভোটেও সিপিএমের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে লড়বে।

দ্বিতীয় উপকরণ: হুমায়ুন কবীর। তাঁর দল জনতা উন্নয়ন পার্টি নতুন হলেও তিনি পুরনো। যিনি ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছেন বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করে। সেই হুমায়ুন খোলাখুলিই সংখ্যালঘুদের তৃণমূল থেকে দূরে রাখার বার্তা দিচ্ছেন। তৃণমূলের অনেকের আশঙ্কা, হুমায়ুন নিজে বা তাঁর সদ্য প্রতিষ্ঠিত দল ক’টা আসন জিতবে, সেটা ভাবার মতো বিষয় নয়। কিন্তু তিনি মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু আসনে ভোট কেটে নিয়ে তৃণমূলের যাত্রা ভঙ্গ করতে চাইবেন বলে আশঙ্কা করছেন শাসকদলের অনেকে।

তৃতীয় উপকরণ: এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের ভোটের জন্য জেলা এবং আসন নির্দিষ্ট করে গত কয়েক মাস ধরে কাজকর্ম শুরু করেছে আসাদউদদিন ওয়াইসির দল ‘মিম’। যে দল আবার জোট বেঁধেছে হুমায়ুনের দলের সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর লাগোয়া বিহারের কিষাণগঞ্জে ‘মিম’ ভাল ফল করেছে দু’মাস আগের ভোটে। ওই করিডর দিয়েই বাংলায় প্রবেশ করতে চাইছে তারা। ডালপালা মেলতে চাইছে মালদহ এবং মুর্শিদাবাদেও।

চতুর্থ উপকরণ: মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরে। ঘটনাচক্রে, গত বিধানসভা নির্বাচনে মালদহ এবং মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে ভাল ফল করেছিল তৃণমূল। এই দুই জেলাতেই ভোট ভাগের সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এ-ও বাস্তব যে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে বাম-কংগ্রেস প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হলেও মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরে তাদের গণভিত্তি এখনও রয়েছে। ভোটও রয়েছে। গত লোকসভা ভোটেও তা স্পষ্ট হয়েছে। বাম-কংগ্রেসের দিকে যে ভোট রয়েছে, তারও মূল ভিত্তি সংখ্যালঘু অংশই। এ বার বাম-কংগ্রেসের জোট নেই, মৌসম বেনজির নূরের মতো গনিখান চৌধুরীর পরিবারের মুখ তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরে গিয়েছেন— ইত্যাদি নানা সমীকরণও আছে। ফলে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার আধারগুলি প্রস্তুত রয়েছে।

সংখ্যালঘুদের বিষয়ে ওয়াকিবহাল অনেক নেতাই মানছেন, নানা কারণে এই অংশে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যে কথা ধরা পড়েছে রাজ্যের মন্ত্রী তথা জমিয়েত উলেমা হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর কথাতেও। সিদ্দিকুল্লার বক্তব্য, ‘‘আমাদের মতো সংগঠন, আমরাও অনেক সময়ে অনেক কিছু ভাবি। কিন্তু দু’পা এগিয়ে আবার পাঁচ পা পিছিয়ে আসি। কারণ, এই মুহূর্তে বাংলাটাকে বিজেপির হাত থেকে বাঁচিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাখাটাই মুখ্য কর্তব্য। বাকি হিসেবনিকেশ পরে হবে।’’ সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের কৌশলে লেনিন বলেছিলেন, ‘এক পা আগে, দু’ পা পিছে’। আর সিদ্দিকুল্লা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আপাতত, দু’পা এগিয়েও পাঁচ পা পিছিয়ে আসার কথা বলছেন। সিদ্দিকুল্লা এ-ও দাবি করছেন যে, সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করার উপকরণ প্রস্তুত হলেও ভোটে তার প্রভাব পড়বে না। পাশাপাশিই, সিদ্দিকুল্লার কথায় এ-ও স্পষ্ট যে, দু’পা এগিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। যদিও তিনি মনে করেন, ওই হিসাব পরেও করা যাবে।

রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে ১৪৬টি বিধানসভা রয়েছে, যেখানে ২৫ শতাংশ বা তার বেশি সংখ্যালঘু অংশের ভোট। এর মধ্যে আবার ৭৪টি বিধানসভায় সংখ্যালঘু ভোট ৪০ শতাংশেরও বেশি। ১৪৬টির মধ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল জিতেছিল ১৩১টিতে। ১৪টি জিতেছিল বিজেপি। আর দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে জিতেছিলেন নওশাদ। তৃণমূলের জয়ের ব্যবধানও ছিল বিপুল। কিন্তু পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতি আর পাঁচবছর পরের পরিস্থিতি এক নয়। এই পাঁচ বছরে বিজেপি হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করার অনুশীলন একনাগাড়ে চালিয়ে গিয়েছে। তা কতটা ফলিত স্তরে দেখা যাবে, সেটা ভোটের ফলাফলে বোঝা যাবে। কিন্তু বিজেপি যখন এই কর্মসূচিতে শান দিচ্ছে, তখন তৃণমূলের সামনে ‘পুঁজি’ ভাঙার উপকরণ প্রস্তুত হয়েছে। তা-ও কতটা ভোটে প্রতিফলিত হবে, সেটাও সময় বলবে। কিন্তু আপাতত শাসকদলের কাছে যে তা ‘চ্যালেঞ্জ’ এবং আগে কখনও এ হেন সমীকরণের মুখোমুখি তৃণমূলকে হতে হয়নি তা মেনে নিচ্ছেন শাসকদলের প্রথম সারির নেতারাও।

West Bengal Assembly Election 2026 West Bengal Politics Minority votes muslim vote
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy