Advertisement
৩০ মে ২০২৪

জেলে মন ভাল রাখতেই দেবযানীর মুখে রূপটান

সংশোধনাগারের সেলে সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় না! মহিলা সেলের দোতলার দালানে এক টুকরো সাজানো বাগান। ফুল ফোটেনি বটে! তবু কেতাদুরস্ত ট্রলিব্যাগ ও রংবেরঙের ব্যাগপত্তর ছিমছাম গোছানো। কম্বলের ওপর ধবধবে চাদর পেতে বিছানাও দিব্যি পরিপাটি। হপ্তায় অন্তত এক বার বাড়িতে কাচতে পাঠিয়ে এই শয্যা পাল্টে ফেলা হয়।

শুভাশিস ঘটক
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০১৫ ০৩:৫২
Share: Save:

সংশোধনাগারের সেলে সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় না!

মহিলা সেলের দোতলার দালানে এক টুকরো সাজানো বাগান। ফুল ফোটেনি বটে! তবু কেতাদুরস্ত ট্রলিব্যাগ ও রংবেরঙের ব্যাগপত্তর ছিমছাম গোছানো। কম্বলের ওপর ধবধবে চাদর পেতে বিছানাও দিব্যি পরিপাটি। হপ্তায় অন্তত এক বার বাড়িতে কাচতে পাঠিয়ে এই শয্যা পাল্টে ফেলা হয়।

এই তপ্ত নিদাঘে মাথার উপরে বনবন করে ঘুরতে থাকা পাখার হাওয়ায় সে-বিছানায় গা এলিয়ে এক তরুণী। মুখে কাদা-কাদা কী যেন মাখা! দেখে অবাক হয়ে উঁকিঝুঁকি মারেন, আশপাশের বন্দিনীরাও। আধশোয়া তরুণীর তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন বিউটি পার্লারে ফেসিয়াল-পর্বে মুখে প্যাক মেখে ‘স্পিকটি নট’ পড়ে রয়েছেন।

স্থান: দমদম সংশোধনাগারের দোতলা, মহিলা সেল। চিটচিটে গরমের দুপুরে প্রসাধনে মেতে থাকা মহিলাকে এ রাজ্যে অনেকেই এক ডাকে চিনবেন। সারদা কেলেঙ্কারির অন্যতম অভিযুক্ত দেবযানী মুখোপাধ্যায়। সিলিং ফ্যানের নীচে সেলের মাঝামাঝি একটি ফাইলে (ওয়ার্ডে শয্যার সারি) মধ্যমণি হয়ে রয়েছেন তিনি।

এমনিতে মহিলা সেলে ঠাসাঠাসি করে থাকেন ১৪০ জন কয়েদি। অনেকেই ছেঁড়া কাঁথায় শোওয়া। কারও সেটুকুও জোটে না। কেউ বা কম্বলটা চার ভাঁজ করে বালিশের বন্দোবস্ত করেন। দেবযানীর কিন্তু ওয়ার্ডরোব, ড্রেসিং টেবিলটাই যা নেই! আট বাই সাড়ে তিন ফুটের সেলে প্রায় একটি সংসার গুছিয়ে বসেছেন তিনি। পুণে ও মুম্বইয়ে ধৃত তিন জন অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি মহিলা জেলে আছেন। তাঁরা বিউটি পার্লারের কাজে দক্ষ। জেল সূত্রে খবর, মাঝেসাঝেই দেবযানীর মুখে প্যাক মাখাতে দেখা যায় ওই মহিলাদের। নিখুঁত ভাবে কাটা নখে নেলপালিশ লাগিয়ে দেন তাঁরাই।

জেল কর্তারা অবশ্য এতে দোষের কিছু দেখছেন না। কারণ দেবযানী বিচারাধীন বন্দি! সাজাপ্রাপ্ত নন! তায় সারদার মতো হেভিওয়েট মামলা! একটু বিশেষ খাতিরদারি তাই ওঁর জন্য বরাদ্দ হয়েছে। তার উপরে জেল সূত্রের খবর, দেবযানীর পিঠে খুব ব্যথা। এই ব্যথা সারানোর কিছু টোটকা, ওষুধটষুধও আদালত ব্যবস্থা করতে বলেছে। দু’জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিনী তাই দেবযানীর খিদমত খাটার কাজে বহাল। খুনের আসামি কৌশল্যা বাস্কে ও নারী পাচারের দায়ে সাজা পাওয়া চাঁদনি বেগম। তাঁদের নিয়ে দেবযানী জেলের ভিতরেই একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন।

সেলের অন্য বন্দিনীরা কেউ কেউ অবশ্য এ জন্য আড়ালে-আবডালে দেবযানীকে ঠেস দিতে ছাড়েন না। গুজগুজ ফুসফুস চলে, ‘নিজের থালাটাও ধোয় না। রাজরানি এসেছে দেখ!’ কৌশল্যা-চাঁদনিরাই নিয়মিত ক্যান্টিন থেকে দেবযানীর খাবার এনে দেন, থালা-বাসন ধুয়ে রাখেন। জেল কর্তৃপক্ষ এ সব ছোটখাটো বিষয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন। কে কী বলছে, আমল দেন না দেবযানীও। দু’চার জন ছাড়া তাঁর সঙ্গে মাখামাখি কারও নেই। জানা গিয়েছে, চাকরি করতে গিয়ে সুদীপ্তর পাল্লায় না-পড়লে এবং রাজ্য ছেড়ে পালানোর সময়ে সুদীপ্তর সঙ্গে না-থাকলে তাঁর ঘাড়ে কোনও দোষই যে পড়ত, তা-ও বলে বেড়ান দেবযানী। এবং বলেন যে, ‘জীবন থেমে থাকে না! যেখানে থাকি, যে ভাবে থাকি, ভাল থাকারই চেষ্টা করব।’

বাড়ির লোকও বিপদে মেয়ের পাশে রয়েছেন। তাঁরাই দেবযানীকে চাহিদামতো পোশাক, টাকাপয়সা জুগিয়ে চলেন। দেবযানী জেলের কিছু ছুঁয়েও দেখেন না। ক্যান্টিন থেকে মাসোহারা দিয়ে পরিমিত খাবার আনান। এক জেল কর্মী বলছিলেন, দেবযানীর জীবনযাত্রা নিটোল ছন্দে বাঁধা। ক্যান্টিনের চা-টোস্ট বা দুধ-কর্নফ্লেক্সে হাল্কা প্রাতরাশ। দিনে ভাত-ডাল-সবব্জি-মাছ বা এক টুকরো মুরগি। রাতে স্রেফ রুটি-সব্জি। মঙ্গলবার নির্জলা উপোস ও সপ্তাহে দু’দিন নিরামিষের মেনুতেও ছেদ পড়তে দেননি।

নিজের থাকার জায়গায় সাঁইবাবার একটি ছবিও রেখেছেন ভক্ত দেবযানী। রোজ সকালে ছবির সামনে নিয়ম করে ঘণ্টাখানেক ধ্যানে বসেন।

মাঝেমধ্যেই রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন আদালতে হাজিরা দিতে হয় তাঁকে। তখন ট্রলিব্যাগ টানতে টানতে জেল থেকে বেরোনো সুবেশা দেবযানীকে দেখে কয়েদি বলে মনেই হয় না। সারদার ‘ম্যাডাম’ যেন ফের ট্যুরে চলেছেন। পরিবারের লোকে মেয়ের মন ভাল থাকবে বলে দেবযানীকে নিয়মিত পোশাক জুগিয়ে চলেন। খাওয়াদাওয়া, হইহুল্লোড়ে তত আগ্রহ নেই। শুধু সাজতেই যা ভালবাসেন।

দমদমে আসার আগে আলিপুর সংশোধনাগার থেকেই সাজগোজের ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল। আলিপুরে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিনীদের প্রশিক্ষণের জন্য রূপচর্চার কোর্স ছিল। সেখানে অনেকেই দেবযানীকে সাজিয়ে হাত পাকাতেন। দেবযানীও উপভোগ করতেন ব্যাপারটা। বরাবরই সাজতে ভালবাসেন। জেলে এসেও সাজের সুযোগ পেয়ে খুশিই হয়েছিলেন।

রূপচর্চা নিয়ে কেউ কিছু বলতে এলে মৃদু স্বরে দেবযানীর একটাই কথা, ‘‘সাজলে মনটা ভাল থাকে!’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE