হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বৈঠকের পরে দলে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে তরুণ নেতা প্রতীক উর রহমানের ‘বিচ্ছেদবার্তা’। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রতীক উরকে কেন্দ্র করে সিপিএম যখন আলোড়িত, তখন ডায়মন্ড হারবারের গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসা তরুণ নেতাকে দলে ধরে রাখতে আসরে নামলেন প্রবীণ নেতা বিমান বসু।
কী করবেন প্রতীক উর? তা নিয়ে অবশ্য মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে ধন্দ জারি রয়েছে।
প্রতীক উর তাঁর ইস্তফাপত্রে লিখেছিলেন, তিনি জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তাই রাজ্য কমিটি এবং জেলার দায়িত্ব থেকেই শুধু অব্যাহতি নয়, পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদও ছেড়ে দিতে চান। প্রতীক উরের চিঠির বয়ানেই স্পষ্ট, তিনি দলের সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটাতেই হ্যাঁচকা টান মারতে চেয়েছেন। অতঃপর অশীতিপর বিমানকে তরুণ নেতার ‘মানভঞ্জন’ করতে নামতে হয়েছে। মঙ্গলবার প্রকীক উর স্বীকার করেছেন যে, তাঁর সঙ্গে বিমানের কথা হয়েছে। এ-ও জানিয়েছেন, তাঁকে রাজ্য দফতরে ডাকা হয়েছে। তিনি কি যাবেন? প্রতীক উরের জবাব, ‘‘ভাবনাচিন্তা করছি।’’
তবে পাশাপাশিই প্রতীক উর এ-ও জানিয়ে দিয়েছেন যে, মঙ্গলবার তিনি আলিমুদ্দিনে যাচ্ছেন না। বুধবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক আছে। তার পরের দু’দিন রাজ্য কমিটির সভা। তখন আলিমুদ্দিনে যাবেন কি না, সে বিষয়েও তিনি এখনই স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি।
এত ভাবনাচিন্তা কেন, তা নিয়েও প্রতীক উর কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, ‘‘পার্টির মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন প্রতীক উর। সেই প্রশ্নের উত্তর না-পেলে তাঁর পক্ষে এর পরে দল করা মুশকিল। আবার তিনি যদি বিমানদার সঙ্গে দেখা করেন এবং তার পরেও উত্তর না-পান, তখন অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নিলে সিপিএমেরই একটা অংশ হইহই করে ময়দানে নামবে এই বলে যে, বিমানদাকেও সম্মান দিল না! ফলে ভাবনাচিন্তা করতেই হবে।’’
প্রতীক উরকে ধরে রাখতে এত মরিয়া কেন সিপিএম? আনুষ্ঠানিক ভাবে এ নিয়ে কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। কিন্তু একান্ত আলোচনায় রাজ্যস্তরের নেতারা তো বটেই, দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সিপিএম নেতাদের বক্তব্য, প্রতীক উর গরিব মুসলমান পরিবার থেকে উঠে এসে রাজ্য কমিটির নেতা হয়েছেন। ছিলেন দলের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের দুই মেয়াদের রাজ্য সভাপতিও। সিপিএমের অনেকের ব্যাখ্যা, দলের রাজ্য সম্পাদক পদে রয়েছেন সংখ্যালঘু অংশেরই সেলিম। এই পর্বে যদি প্রতীক উরের মতো তরুণ এবং প্রান্তিক অংশ থেকে উঠে আসা তথা আর্থিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে প্রতিদিন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যুঝে যাওয়া তরুণ নেতা দল ছেড়ে বেরিয়ে যান, তা সার্বিক ভাবে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে ‘সঠিক বার্তা’ দেবে না। সিপিএমের অনেকের ব্যাখ্যা, প্রতীক উর গোটা রাজ্যের বাম মহলেই ‘লড়াকু’ হিসাবে পরিচিত। গত লোকসভা ভোটে তিনি ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে মারও খেয়েছেন। সিপিএমের এক নেতার কথায়, ‘‘আমরা যে শ্রেণির কথা বলি, প্রতীক উর সেই অংশ থেকে উঠে আসা নেতা। তাঁকে ধরে রাখতে দল সক্রিয় হবেই। কিন্তু আরও আগে এই সক্রিয়তা দেখালে এই পরিস্থিতিটাই হয়তো তৈরি হত না।’’
সিপিএমের বিভিন্ন দলিলেই উল্লিখিত হয়েছে যে, গত কয়েক দশকে দলের অন্দরে ‘মধ্যবিত্ত মানসিকতা’ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতীক উর যে আর্থ-সামাজিক অংশ থেকে উঠে এসে সিপিএম করেছেন, তা দলের ব্যাকরণের সঙ্গে যায়। সিপিএমের অনেকের বক্তব্য, এই মুহূর্তে দলের প্রথম সারিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে রামচন্দ্র ডোম, দেবলীনা হেমব্রম আর নিরাপদ সর্দার ছাড়া ‘প্রান্তিক’ অংশের নেতা সেই অর্থে নেই। সেই প্রেক্ষাপটে প্রতীক উরের দল ছাড়ার সিদ্ধান্তকে ‘ক্ষতি’ হিসাবেই দেখছেন অনেকে।
সেই সূত্রেই দলের অনেকে ইতিহাস ঘাঁটতে শুরু করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, গত দুই-আড়াই দশকে সংখ্যালঘু অংশের প্রথম সারির একাধিক নেতা সিপিএম ছেড়েছেন। সেই তালিকায় নাম রয়েছে সইফুদ্দিন চৌধুরী, মইনুল হাসান, আব্দুস সাত্তারদের। মইনুলেরা যখন সিপিএমের নেতা, দলের অন্দরে তাঁদের বক্তব্য ছিল, মুর্শিদাবাদের মতো জেলা, যেখানে শতকরা ৭০ ভাগই মুসলিম, সেখানে দলের জেলা সম্পাদকের নাম মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য বা নৃপেন চৌধুরী হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তখন সে হেন বক্তব্যকে অনেকেই ‘সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসাবে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সিপিএমকে সেই পথই অনুসরণ করতে হয়েছে। কারণ, গত দু’টি মেয়াদে মুর্শিদাবাদের সিপিএমের জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন জামির মোল্লা। ঘটনাচক্রে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শূন্যের গেরো কাটাতে যে মুর্শিদাবাদ জেলার উপর ভরসা করছে সিপিএম।
ঘটনাচক্রে, প্রতীক উরের দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলারই সংখ্যালঘু নেতা রেজ্জাক মোল্লাও সিপিএম ছেড়েছিলেন। গিয়েছিলেন তৃণমূলে। দ্বিতীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন। সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী (হোলটাইমার) প্রতীক উর কী করবেন? তাঁর ঘনিষ্ঠেরা প্রকাশ্যেই বলছেন, দলবদলের জল্পনা উস্কে আসলে প্রতীক উরের উপরে স্নায়ুর চাপ তৈরি করতে চাইছে সিপিএমেরই একাংশ। কিন্তু পাশাপাশি এ-ও বলছেন, রাজনীতি মানে সম্ভাবনারও শিল্প।