অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে পুলিশ। তাঁর খোঁজে শুক্রবার রাত ৩টের সময়ে কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় অভিষেকের বাড়িতে হানা দেয় তদন্তকারীরা। তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকে। তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেকের সঙ্গে এই সুমিতের যোগাযোগ ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের বন্ধু দু’জনে। সেই বাল্যবেলার বন্ধুই এখন হয়ে উঠেছেন অভিষেকের আপ্তসহায়ক।
দক্ষিণ কলকাতার নবনালন্দা স্কুলে পড়তেন অভিষেক। দক্ষিণ কলকাতার ভূমিপুত্র সুমিতও অভিষেকের সহপাঠী ছিলেন নবনালন্দায়। অভিষেক এখানে পড়াশোনার পরে দিল্লিতে চলে যান। তবে সুমিতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল। রাজ্য সক্রিয় রাজনীতিতে অভিষেকের আবির্ভাব হয় তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে। ২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজনীতিতে আগমন হয় তাঁর। তৈরি হয় যুবা। তার মাথায় বসানো হয় অভিষেককে। সেই থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে ধীরে ধীরে উত্থান শুরু হয় অভিষেকের। হয়ে ওঠেন ‘যুবনেতা’ অভিষেক। এই উত্থানের সময়ে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বেশ কয়েকটি স্তর ছিল। সেই স্তরে অভিষেকের থেকে একটু দূরে চলে গিয়েছিলেন সুমিত। বৃত্তের মধ্যেই ছিলেন, তবে একটু দূরে।
ওই সময়ে অভিষেকের সবচেয়ে কাছাকাছির বৃত্তে থাকতেন অন্যেরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম বিনয় মিশ্র। এর পরের স্তরে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা হলেন— প্রতীক দেওয়ান, রোহিত অগ্রবাল, করণ শর্মা। তার পরের যে স্তর ছিল, সেখানে ছিলেন সুমিত। পরবর্তী সময়ে কয়লাপাচার মামলায় বিনয়ের নাম জড়িয়ে যায়। তিনি ধীরে ধীরে ছিটকে যেতে থাকেন অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত থেকে। এর পরে নানা কারণে প্রতীক, রোহিত, করণেরাও অভিষেকের কাছাকাছি বলয় থেকে দূরে সরতে থাকেন। এর ফলে যে ‘শূন্যস্থান’ তৈরি হয়, সেই সময়ে অভিষেকের কাছাকাছি চলে আসেন সুমিত।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে সুমিত ক্রমশ ‘ওজনদার’ হয়ে উঠতে থাকেন তৃণমূলের অন্দরে। যা আরও গতি পায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে। একটি পর্যায়ে সুমিতই হয়ে ওঠেন সংগঠন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নজরদারি চালানোর ক্ষেত্রে অভিষেকের চোখ এবং কান। অভিষেকের সংসদীয় এলাকায় ডায়মন্ড হারবারের কাজকর্ম দেখা, জেলা সংগঠনগুলির সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের সমন্বয়, আইপ্যাকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সাংগঠনিক রদবদলের ক্ষেত্রে নেতাদের কাজকর্মের জরিপ করা— এই সবই করতেন সুমিতই। তৃণমূলের সংগঠন এবং অভিষেকের মাঝখানে সবসময় দণ্ডায়মান থাকতেন তিনি। কারণ, অভিষেকই তাঁকে সেই জায়গাটা দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, এ বারেও বিধানসভা নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রের প্রার্থীচয়নে সুমিতের ভূমিকা ছিল। অভিষেক-ঘনিষ্ঠ একাধিক যুব নেতা অভিষেককে ‘বস’ এবং সুমিতকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলে অভিহিত করতেন। হাওড়া সদরের তৃণমূল যুব সভাপতি ছিলেন কৈলাস মিশ্র। তিনি এ বারের নির্বাচনে বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি প্রায়ই হোয়াটসঅ্যাপ স্টেটাসে অভিষেককে ‘বস’ বলে অভিহিত করতেন। সঙ্গে সুমিতের ছবি দিয়ে লিখতেন ‘ক্যাপ্টেন’।
অভিষেকের একদা ঘনিষ্ঠ এবং বর্তমানে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হওয়া প্রাক্তন মুখপাত্র ঋজু দত্ত বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ করা যেত না। তাঁর কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিলেন সুমিতই।” পরে তিনি এক্স পোস্টে লিখেছেন, “সুমিত রায় কে, সেটা তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়কেরা খুব ভাল করে জানেন।”
আরও পড়ুন:
শুক্রবার রাত ৩টে নাগাদ অভিষেকের কালীঘাটের বাড়ির সামনে পৌঁছে যায় শালবনি থানার পুলিশ। সঙ্গে ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় বাড়ির বাইরে। পরে তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকে পুলিশ। তল্লাশি চলে প্রায় ৯০ মিনিট। তবে অভিষেকের বাড়ি থেকে কিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়নি শনিবার। পুলিশের একটি সূত্রের খবর, সুমিতের মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন শেষ বার তারা দেখেছিল অভিষেকের বাড়িতেই। সেই সূত্র ধরেই চলে অভিযান। এই অভিযানের খবর পেয়ে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। পরে সকাল ৮টার পর পুলিশ অভিষেকের বাড়ি থেকে বেরোয়। অভিষেক তখন বেরিয়ে বলেন, ‘‘তালা ভেঙে ঢুকে পুরো বাড়ি ওরা সার্চ করেছে। সব রেকর্ড রয়েছে।’’
হুগলির শ্রীরামপুরে সুমিতের শ্বশুরবাড়ি রয়েছে। শনিবার সেখানেও হানা দেয় পুলিশ। তবে অভিষেকের আপ্তসহায়ককে সেখানেও পাওয়া যায়নি। ভোটের সময় বেশ কয়েক বার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন সুমিত। সেই সূত্র ধরে শ্রীরামপুরে সুমিতের শ্বশুরবাড়িতে হাজির হয় পুলিশ। সুমিতের শাশুড়ি জানান, গত দু’-এক দিনের মধ্যে তিনি শ্বশুরবাড়ি আসেননি। জামাই এখন কোথায়, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে দৃশ্যত অসন্তুষ্ট এবং ক্ষুব্ধ হয়ে প্রৌঢ়া বলেন, ‘‘জানি না! ও কোথায় আছে, আপনারা খুঁজুন। খুঁজুন, খুঁজুন। দেশের পুলিশ-প্রশাসন আছে, তারা খুঁজে আনুক।’’