E-Paper

ফিরবে কি সোমেন-সূর্যদের অনাক্রমণ, চর্চা দুই শিবিরে

বিধানসভা ভোটে ২০০১ ও ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয়েছিল কংগ্রেসের। বামেদের সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়েছিল ২০১৬ ও ২০২১ সালে। মাঝে ২০০৬ এবং এখন ২০২৬ সালে কংগ্রেস একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
একটি চিত্র প্রদর্শনীতে বাম নেতা বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র ও প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্র।

একটি চিত্র প্রদর্শনীতে বাম নেতা বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র ও প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্র। —ফাইল চিত্র।

রাজ্যে গত ২৫ বছরে একাধিক বার জোট করে এবং জোট ভেঙে এগিয়েছে কংগ্রেস। তাদের সর্বশেষ সমঝোতা ছিল বামেদের সঙ্গে, যা থেকে বেরিয়ে এ বার বিধানসভা নির্বাচনে একা লড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরস্পরের হাত ছেড়ে দেওয়ার পরে পুরনো সঙ্গীদের মধ্যে ৭ বছর আগের মতো ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ হতে পারে কি না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেসের একাংশে। দু’দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের অনাক্রমণে খুব অনাগ্রহ নেই। তবে অন্য পক্ষ সংযত হলে তবেই এমন ‘বোঝাপড়া’ রক্ষা করা সম্ভব বলে দুই শিবিরেরই মত!

বিধানসভা ভোটে ২০০১ ও ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয়েছিল কংগ্রেসের। বামেদের সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়েছিল ২০১৬ ও ২০২১ সালে। মাঝে ২০০৬ এবং এখন ২০২৬ সালে কংগ্রেস একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তৃণমূলের সঙ্গে জোটের কাহিনি এখন সুদূর অতীত। তবে বামেদের সঙ্গে সমঝোতা যে হেতু কয়েক মাস আগে কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও ছিল, তাই তার রাজনৈতিক রেশ রয়ে গিয়েছে। এবং সেই সূত্রেই চর্চায় আসছে অনাক্রমণের কথা।

প্রয়াত সোমেন মিত্র প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলোচনা এগিয়েও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও বামেদের সমঝোতা হয়নি। কিন্তু তার পরেও মালদহ দক্ষিণ ও বহরমপুর কেন্দ্রে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট প্রার্থী না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত ভেঙে আরএসপি বহরমপুরে প্রার্থী দাঁড় করালেও সিপিএম তার শরিক দলকে সমর্থন করেনি, পাশে ছিল কংগ্রেসের! পাল্টা ‘সৌজন্য’ দেখিয়ে কংগ্রেসও সে বার যাদবপুরে সিপিএমের বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য ও বাঁকুড়ায় অমিয় পাত্রের (তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়) বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়নি। মালদহ দক্ষিণ ও বহরমপুর থেকে কংগ্রেসের আবু হাসেম (ডালু) খান চৌধুরী ও অধীর চৌধুরীই জিতেছিলেন। সিপিএম কোথাও জয়ী হয়নি। ভোটের প্রচারে কংগ্রেস ও সিপিএমের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল বিজেপি এবং তৃণমূল, পরস্পরের দিকে তির নিক্ষেপ হয়নি। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তখন সূর্যকান্ত মিশ্র।

এ বারে এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি ভিন্ন। কংগ্রেস একা লড়ার ঘোষণা আনুষ্ঠানিক করার আগেই তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিকে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তার জবাবে আসরে নেমেছে কংগ্রেসের একাংশ। পরে মুখ খুলেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও। সিপিএমের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে, দু’দিন আগেই যে কংগ্রেসের হাত ধরতে চাওয়া হচ্ছিল, তারা একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিতেই সেই দলের সংগঠন বা শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যুক্তি কী! তা ছাড়া, এই তরজা আখেরে বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করে দিতে পারে।

অনাক্রমণ সংক্রান্ত প্রশ্নে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর বলছেন, ‘‘সময়ের চাহিদা মেনে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার উপরে সিদ্ধান্ত হয়। আপাতত জোট নয়, আমরা একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু সেই কারণেই সদ্য অতীতের সহযাত্রীকে অপর পক্ষের কটাক্ষ, আক্রমণ কাঙ্ক্ষিত নয়। কোন দলের কতটুকু সংগঠন বা কত জন কর্মী আছে, সে সব নিয়ে মাথা ঘামানো নিষ্প্রয়োজন। বিজেপি ও তৃণমূলের মতো দুই স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গেলে নিজেদের নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ ঠিক রাখা প্রয়োজন। আমি নিজে রাজনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলার পক্ষপাতী, সহকর্মীদেরও সেই কথাই বলছি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘যেন তেন প্রকারে এক জন বিধায়ক পাওয়ার চেয়ে ভবিষ্যতে ১০০ জন বিধায়ক তৈরির পরিবেশ তৈরি করা বেশি জরুরি। তার জন্য নীতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে লড়তে হবে।’’

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীরও মত, ‘‘কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় দল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রদেশ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল এবং থাকবে বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সব শক্তি ও মানুষকে এক জায়গায় আনা। যাঁরা এর বাইরে থাকলেন, তাঁরা একসঙ্গে হলেই ভাল হত। তবে আমাদের আক্রমণের সূচিমুখ বিজেপি ও তৃণমূলের দিকেই থাকবে।’’

তবে দুই শিবিরেরই একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, সোমেন-সূর্য নিজেরা ছিলেন মিতভাষী। তাঁদের সময়ে দুই দলেই বিচক্ষণ বেশ কিছু নেতা সক্রিয় ছিলেন। লোকসভা ভোটে জোট না-হলেও বিধানসভার অন্দরে পাঁচ বছর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন বিরোধী দলনেতা, কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান, সিপিএমের সুজনেরা। এখন দুই দলেই শীর্ষ নেতাদের পারিষদ বর্গ পান থেকে চুন খসলে ঢাল-তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন! তারই পাশাপাশি, আলাদা লড়াই হলে সংখ্যালঘু জনতা শাসক তৃণমূল ছাড়া কতটা কংগ্রেস আর কতটা বামেদের উপরে ভরসা রাখবে, সেই প্রশ্নে উদ্বেগ আছে সিপিএম শিবিরে। কংগ্রেসের বড় অংশ অবশ্য মনে করছে, তারা একাই যথেষ্ট।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

CPM Congress

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy