Advertisement
E-Paper

ছৌয়ের আসর মাত করছে মেয়েরা

পৌরাণিক আখ্যান থেকে বেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের নাটক বেছে নেওয়া আগেই শুরু হয়েছিল। এত দিনের পুরুষ প্রাধান্য শেষ করে এ বার সামনে আসছেন মেয়েরা।

প্রশান্ত পাল

শেষ আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৪৯
ছৌ নাচের ছবিটি তুলেছেন সুজিত মাহাতো।

ছৌ নাচের ছবিটি তুলেছেন সুজিত মাহাতো।

পাল্টে যাচ্ছে ছৌ।

পৌরাণিক আখ্যান থেকে বেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের নাটক বেছে নেওয়া আগেই শুরু হয়েছিল। এত দিনের পুরুষ প্রাধান্য শেষ করে এ বার সামনে আসছেন মেয়েরা।

ঝালদার বামনিয়ায় সোমবার যে সাত দিনের ‘ছৌ-ঝুমুর উৎসব’ শেষ হল, তাতে পুরুলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২৫টি দল যোগ দিয়েছিল। তার মধ্যে মেয়েদের দু’টি দলও ছিল। একটি বলরামপুরের, অন্যটি কেন্দার। তারা ইতিমধ্যে দিল্লিও ঘুরে এসেছে।

Advertisement

ছৌ নাচে মেয়েদের আসা শুরু বছর দুয়েক আগে বলরামপুরের ছৌ শিল্পী জগন্নাথ চৌধুরীর হাত ধরে। তাঁর কথায়, ‘‘মেয়েরা ছৌ নাচ প্রদর্শন করছে, এটা এক সময়ে ভাবাও যেত না। আমার দুই মেয়ে আর এলাকার কয়েকটি মেয়েকে নিয়ে শুরু করি। আজ অন্য দল তা দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, এটা আমাদের পাওনা।’’

উৎসব কমিটির অন্যতম কর্তা উৎপল দাসের কথায়, ‘‘মেয়েরা তো জিমন্যাস্টিক করে। ছৌ তো সেই জিমন্যাস্টিকেরই আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়। জগন্নাথ চৌধুরীর দলের পরে এ কেন্দার কোণাপাড়ার একটি মেয়েদের দল পালা নিয়ে এসেছে, চার বছরের উৎসবে এটা আমাদের বড় পাওনা।’’

পুরুলিয়ায় কমবেশি আড়াইশো ছৌ দল রয়েছে। এক-একটা দলে শিল্পী কমবেশি তিরিশ-পঁয়ত্রিশ জন। তাঁরা যে টাকায় পালার বায়না পান, তাতে শিল্পীদের ভাগে খুব অল্প টাকাই জোটে। উৎপলবাবু বলেন, ‘‘ছৌ-এর কদর রয়েছে সারা বিশ্বে। কিন্তু শিল্পের সংস্কার না হলে তা একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই সংস্কারের লক্ষ্যেই আমরা এই উতসব শুরু করেছি।’’

স্বাভাবিক ভাবেই ভাঙা হচ্ছে চালু রীতিনীতির বেড়া। মহিষাসুর বধ বা রামায়ণের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিমধ্যেই মঞ্চস্থ করা হয়েছে ‘ম্যাকবেথ’, ‘কালমৃগয়া’, ‘চিত্রাঙ্গদা’। এ বার হল ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছৌ নৃত্যে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ পরিবেশিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে এ বছরই শুরু হয়েছে ছৌ-এর ডিপ্লোমা কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন আধিকারিক স্বাতী গুহ বলেন, ‘‘ছৌ নাচে রবীন্দ্রনাথের যে সমস্ত নৃত্যনাট্যগুলি করা সম্ভব, তা আমরা করার চেষ্টা করছি। এ বার বাল্মীকি প্রতিভা করা হয়েছে।’’

এই উৎসব সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রতি বারই বড় ভূমিকা থাকে ‘বাংলা নাটক ডট কম’ নামে একটি সংস্থার। তাদের তরফে সুমন দাস জানান, যে সব পালা এখনও পুরাণের কাহিনি-নির্ভর, সেগুলির নৃত্যশৈলীতেও নানা পরিবর্তন এনেছে দলগুলি। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এটাই চেয়েছিলাম। বিভিন্ন দল একে অপরের ভাল বা সদর্থক দিকগুলি গ্রহণ করুক।’’

এ বার বিশেষ নজর কেড়েছে পুরুলিয়া ২ ব্লকের শীতলপুরের ছৌ দল। সেটির পরিচালক তারাপদ রজক বলেন, ‘‘আমরা ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ পালা উপস্থাপন করেছি। শো শেষেই কয়েকটি বায়না পেয়েছি।’’ ঝালদা ২ ব্লকের একটি ছৌ দলের পরিচালক তথা গুরু দীনবন্ধু মাহাতোর কথায়, ‘‘নিজেদের নাচ দেখানোর পাশাপাশি অন্য নানা দলের নাচ দেখারও সুযোগ পাচ্ছি এখানে, এটা খুবই ভাল কথা।’’ কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক থেকে এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা বৃত্তি পেয়েছিলেন বান্দোয়ানের এক ছৌ গুরু শম্ভুনাথ কর্মকার। সেই টাকা দিয়ে তিনি স্থানীয় আসপাড়া গ্রামে ছৌ-নৃত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। উৎসবে এসেছিলেন ‘হিরণ্যকশিপু বধ’ পালা নিয়ে। তাঁর কথায়, ‘‘উৎসবের এই মঞ্চও তো শিক্ষারই মঞ্চ।’’

আগে ছৌ হত কেবল রাতে। এখন এই উৎসবের সৌজন্যে দিনেও হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলায় এসে বান্দোয়ানে ছৌ অ্যাকাডেমি গড়ার আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন। চতুর্থ বর্ষে এ বার উৎসবে যোগ হয়েছে ঝুমুর। বিশিষ্ট ঝুমুর শিল্পী মিহিরলাল সিংহ দেও বলেন, ‘‘ঝুমুরের একটা পৃথক জায়গা তো রয়েইছে। তার চর্চা বাড়লে শিল্পী ও শিল্পের জন্য তা সুখবর।’’ একই কথা ঝুমুর রচয়িতা সুনীল মাহাতোরও।

ছৌ আর ঝুমুরের এই পথচলা নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, আশা পোড়-খাওয়া বহু শিল্পীরই।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy