Advertisement
E-Paper

ঘরের দুয়ার ঘেঁষা প্রকৃতিই পাহাড়ে টেনেছে

স্মৃতি অনেক সময় ছাপিয়ে ওঠে পাহাড়চুড়োর ভাবনাকেও। নগর জীবনের হাজারো কোলাহল, ব্যস্ততার মাঝে যখনই এতটুকু সময় মেলে, নিজের সঙ্গে কথা শুরু হয়ে যায়। সেই আমি এই আমি নই। নানা আমি, তারা বয়সে অনেক ছোট। কৃষ্ণনগর শহরের প্রান্তে ঘূর্ণির গাঙ্গুলিপাড়ায় একটা ভাড়া বাড়িতে বসত প্রাইমারি স্কুল।

বসন্ত সিংহ রায়

শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:১২

স্মৃতি অনেক সময় ছাপিয়ে ওঠে পাহাড়চুড়োর ভাবনাকেও।

নগর জীবনের হাজারো কোলাহল, ব্যস্ততার মাঝে যখনই এতটুকু সময় মেলে, নিজের সঙ্গে কথা শুরু হয়ে যায়। সেই আমি এই আমি নই। নানা আমি, তারা বয়সে অনেক ছোট।

কৃষ্ণনগর শহরের প্রান্তে ঘূর্ণির গাঙ্গুলিপাড়ায় একটা ভাড়া বাড়িতে বসত প্রাইমারি স্কুল। ইনফ্যান্টে ভর্তি হয়ে হাতে বর্ণপরিচয় আর বসার আসন বগলদাবা করে, ঢিলে হয়ে যাওয়া প্যান্ট সামাল দিতে-দিতে আপন মনে স্কুলে যাওয়া।

আমাদের সেই স্কুলে ছিলেন মাত্র তিন শিক্ষক আর চার শিক্ষিকা। পড়াশোনা করতে হতো ঠিকই, তবে চাপ ছিল না। একটা ঘটনা বেশ মনে আছে। রেজাল্ট বেরিয়েছে। অঙ্কে ফেল করেছি। বাড়ি এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে গর্বের সঙ্গে বলছি— ‘‘মা, সবেতেই পাশ, অঙ্কে ফেল।’’ সেই শুনে মায়ের সে কী হাসি!

স্কুল বাদে বাকি বেশির ভাগটাই কাটত মাঠে-ঘাটে, নদীতে, জঙ্গলে দস্যিপনা করে। কৈশোরের সেই অ্যাডভেঞ্চারমুখর দিনগুলো কিন্তু আজকের এই বড়-বড় অভিযানের চেয়ে কম আনন্দের ছিল না। বাড়ির পাশেই ছিল মস্ত বাঁশবাগান । দিনের বেলাতেই ভয় ধরাত ঘন জঙ্গলের আবছায়া। রাত হলে তো কথাই নেই। সন্ধে নামলেই শেয়াল ডেকে উঠত। প্রথমে একটা, তার পর সবাই মিলে। ডেকে উঠত কুকুরেরাও, নিরাপদ দূরত্ব থেকে। রাতচরা পাখি আর কালপেঁচার আর্তনাদ মিলিয়ে কেমন যেন গা ছমছমে ভুতুড়ে পরিবেশ। কিশোরমন তখন কল্পনার পালকে ভর করে উড়ে চলত এক অজানা রহস্যময় অ্যাডভেঞ্চারের জগতে।

ভোর হলেই পাড়ার মোরগগুলো চিৎকার করে ঘুম ভাঙিয়ে দিত। মাঝে মাঝে একটা পাখি ডাকত, তার ডাক শুনলে আমরা বলতাম, আজ বাড়িতে কুটুম আসবে। আমরা তাকে বলতাম ‘কুটুম পাখি’। আজ সে পাখিও আর দেখি না, আর বাড়িতে আত্মীয়-কুটুমও আসে না সে রকম। কোথায় সব হারিয়ে গেল কে জানে?

সন্ধে নামলে পিঠোপিঠি চার ভাই হ্যারিকেনের চারপাশে গোল হয়ে বসে পড়তাম। যার দিকে আলো কম পড়ত, সে-ই টুক করে নিজের দিকে হ্যারিকেন ঘুরিয়ে নিত। গরমকালে যখন কালবৈশাখী ঝড় উঠত, আমরা ঝোলা নিয়ে আমবাগানে ছুট দিতাম। বর্ষায় টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর ব্যাঙের ডাকের যুগলবন্দি। সেই সঙ্গে ঝিঁঝিঁর কনসার্ট। প্রকৃতির সেই সঙ্গীত শুনতে-শুনতেই ঘুম পেয়ে যেত। মায়ের কাছে আবদার করতাম, এখন শুয়ে পড়ি, কাল সকালে উঠে পড়ব তাড়াতাড়ি। মা মেনেও নিতেন।

শীতের সকালে চাদর মুড়ি দিয়ে খেজুর রস খাওয়া বা দুপুরে ঘাসের উপর খেজুর পাতার মাদুর পেতে লেপ চাপা দিয়ে ভাতঘুম— এ কি ভোলা যায়? বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে জলঙ্গি নদী। ছুটিতে বাড়ি এলে বাবা নদীতে নিয়ে যেতেন সাঁতার শেখাতে। বড় হয়ে আমরা নদী এ পার-ও পার করতাম। কত মজাই না হতো। ছোটবেলায় ছেলেমেয়ের তো কোনও ভেদ ছিল না। সবাই একসঙ্গে খেলতাম হিচ্চে, গাদি, ক্রিং, গোল্লাছুট, শতলিয়া, হাডুডু, আরও কত কী! পরে শুরু হয়েছিল ভলিবল, ক্রিকেট, ফুটবল। বলে হাওয়া ভরা, ব্লাডার বেঁধে বলের মধ্যে ঢোকানো, সে ছিল এক ঝকমারি কাণ্ড। বিভিন্ন বাগানের এ-গাছ ও-গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়িয়ে আম, জাম, বেল, ফলসা, আরও কত রকমের ফল যে খেতাম, তা বলে শেষ করা যাবে না।

আমাদের সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু তা বলে খুশির কমতি ছিল না। বরং টানাটানির সংসারে মানুষ হয়েছি বলেই বোধহয় পরে আকাঙ্ক্ষার জিনিসগুলো একটু-একটু করে যখন পেতে লাগলাম, সে একটা অন্য রকম আনন্দ! বাড়ির কাছেই ছিল মৃৎশিল্পী পালেদের কারখানা। অবাক হয়ে দেখতাম, গোল চাকতি ঘুরছে আর হাতের নিখুঁত ছোঁয়ায় উঠে আসছে মাটির গ্লাস, ঘটি, খেজুর রসের ভাঁড়, ফুলের টব আরও কত কী! সেই দেখাতেও যে কত আনন্দ!

প্রাইমারির পাঠ সেরে ভর্তি হলাম ঘূর্ণি হাইস্কুলে। তখন চুটিয়ে ক্রিকেট-ফুটবল, নাটক, পুজো-পার্বনের প্রস্তুতি। পরে গেলাম কৃষ্ণনগর হাইস্কুলে। মন গেল সমাজসেবায়। সেই অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছে দক্ষ সংগঠক হতে, বিভিন্ন অভিযানে সফল দলনেতা হতে। পরে কৃষ্ণনগর সরকারি মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই চাকরির সন্ধানে দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছি। কলেজে এনসিসি-তে যোগ দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় শিবির করে থেকেছি, সাইকেলে কলকাতা-পুরী অভিযান করেছি।

কলেজ শেষে কলকাতায় চাকরি জুটল। টানা দু’দশক ধরে কৃষ্ণনগর-কলকাতা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে ক্লান্ত হয়ে শেষে কলকাতায় থাকতে শুরু করেছি। কিন্তু কৃষ্ণনগরই আমার সব। এখনও ওটাই স্থায়ী ঠিকানা। অনেক কিছু পাল্টে গিয়েছে। বাড়িঘর বেড়েছে, তবে গাছপালাও আছে। অনেক পাখিরও দেখা মেলে আজও। ছোটবেলায় আমার পড়শি ছিল এই প্রকৃতিই। তারই টানে পরে পড়শি হয়েছে পাহাড়। পর্বতাভিযানে গিয়ে ছোঁয়া হয়েছে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণার মতো সুউচ্চ শৃঙ্গগুলো। ধবলগিরি অভিযানে হাত মিলিয়ে এসেছি মৃত্যুর সঙ্গেও। ভয়াল হলেও সে-ও তো প্রকৃতিরইএক রূপ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy