জমা পলি ও কচুরিপনার জঙ্গল রীতিমতো বিড়ম্বনায় ফেলেছে ফরাক্কা–হলদিয়ার ১ নম্বর জলপথ পরিবহণকে। পলি জমছে ফরাক্কার ফিডার ক্যানালে। তাতে আটকে যাচ্ছে ছোট, বড় জাহাজ। কপালে ভাঁজ পড়েছে ১ নম্বর জাতীয় জলপথ কর্তৃপক্ষেরও। পরিস্থিতি দেখে ফিডার ক্যানালের লকগেট এলাকায় ড্রেজিং শুরু করেছে জাতীয় জলপথ কর্তৃপক্ষ।
হলদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত প্রায় ১৬২০ কিলোমিটার গঙ্গার জলপথ। সেই জলপথকে যাতায়াতের উপযুক্ত মাধ্যম করতে ইতিমধ্যেই উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ সড়ক ও রেল পরিবহণের থেকে খরচ ও ঝুঁকি অনেক কম জলপথ পরিবহণে। গঙ্গাপাড়ের শহরগুলির পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে আরও বেশি করে গঙ্গার জলপথ পরিবহণকে ব্যবহার করায় জোর দিতে কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। ফলে ফরাক্কার ফিডার ক্যানাল দিয়ে জাহাজ যাতায়াতের সংখ্যাও বেড়েছে। ফরাক্কায় ৪৮০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ফ্লোটিং টারমিনালও গড়া হয়েছে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে লকগেট লাগোয়া ফিডার ক্যানাল চত্বরে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃস্টি করছে জমে থাকা পলি ও আগাছার জঙ্গল। ফরাক্কা ব্যারাজের পদস্থ এক কর্তা বলছেন, ‘‘ফরাক্কায় ফিডার ক্যানালে জাহাজ চলাচলের জন্য অন্তত পক্ষে আড়াই থেকে তিন মিটার গভীরতা প্রয়োজন। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই পলি পড়ে কমে গভীরতা এক-দেড় মিটারে নেমে এসেছে।’’ এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ কোটি টন পলি ভেসে এসে ফরাক্কা ব্যারাজের আশপাশে জমছে প্রতি বছর। গত চার দশক ধরে এমনটাই চলছে। ফরাক্কার ডিয়ার ফরেস্টের কাছে লক গেট এলাকায় তাই ড্রেজিং করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ, সেই পথ ধরেই লক গেট পার হয়ে জাহাজগুলি মূল গঙ্গায় গিয়ে পড়ে।
ড্রেজিং করার পরে সেই পলি নদীর পাড়ে তুলে রাখার ফলেও সমস্যা হচ্ছে। কেননা, সেই পলি আবার গিয়ে পড়ছে ফিডার ক্যানালের জলে। এর ফলেই জাহাজ আটকাচ্ছে। ব্যারাজের ওই কর্তা জানান, কেন্দ্রীয় সরকার ওই জলপথের উপর ১০০ কিলোমিটার অন্তর একটি করে নতুন ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘‘এই ব্যারাজগুলি তৈরি হলে পলি জমার মাত্রা অনেকটা কমতে পারে ফরাক্কায়’’, মত ওই কর্তার। সেটা কী ভাবে হবে? তাঁর ব্যাখ্যা, ফরাক্কা থেকে এলাহাবাদের দূরত্ব প্রায় ১০৬০ কিলোমিটার। সেক্ষেত্রে অন্তত ১০টি ব্যারাজ তৈরি হবে ওই জলপথে। গোটা বিষয়টির তত্ত্বাবধানে জলপথ পরিবহণ মন্ত্রকের সচিবকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পরিস্থিতি দেখে গিয়েছেন দু’টি বিশেষজ্ঞ সংস্থা। ব্যারাজগুলি তৈরি হলে পলির (সেডিমেন্টের) বিরাট অংশ আটকে যাবে ওই সব ব্যারাজগুলিতে। ফলে ফরাক্কায় পলির পরিমাণ অনেকটা কমবে।
যদিও ফরাক্কা দিয়ে নদীপথে জাহাজ চলাচলে আপত্তি তুলেছে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এই মতের পক্ষে রয়েছেন কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান পরিতোষ ত্যাগী-সহ অন্তত ১০ জন বিশিষ্ট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। এ ব্যাপারে তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে লিখিত প্রতিবাদও জানিয়েছেন। সেই কপি পাঠানো হয়েছে ফরাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষকেও। তাতে বলা হয়েছে, গঙ্গার জলপথে জাহাজ চলাচল যত বাড়বে পরিবেশের ক্ষতি তত বেশি হবে। তাঁদের মত, জলপথ পরিবহণে খরচ কিছু বাঁচানো গেলেও এর ফলে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত যে সব সমস্যার সৃস্টি করবে তা ওই আর্থিক খরচের থেকে ঢের বেশি। জাহাজের সংখ্যা বাড়লে শুশুক এবং মাছের ক্ষতি হবে। জাহাজের তেল মিশবে গঙ্গার জলে।
ফরাক্কার জেনারেল ম্যানেজার সৌমিত্র কুমার হালদার অবশ্য বলছেন, ‘‘জাহাজ চলাচলের সুবিধের জন্যই ফিডার ক্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং করা হয়। এর বাইরে মূল গঙ্গায় কোনও ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা নেই।’’ তিনি জানাচ্ছেন, এর গোটাটাই দেখাশোনা করে ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ ট্রান্সপোর্ট। ওয়াটারওয়েজ ট্রান্সপোর্টের এক কর্তার মত, ‘‘জল পরিবহণ আর্থিক দিক থেকে সাশ্রয়ের। শুধু তাই নয়, পরিবেশ এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও লাভদায়ক।’’
যুক্তি হিসেবে তিনি রেল মন্ত্রকের সমীক্ষার উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, এক অশ্বশক্তি ক্ষমতার যান সড়ক পথে ১৫০ কিলোগ্রাম মাল বহনে সক্ষম। রেলপথে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ কিলোগ্রাম এবং জলপথে ৪০০০ কিলোগ্রাম। এক লিটারে সড়ক পথে যাওয়া যায় ২৪ টন প্রতি কিলোমিটার, রেলে ৮৫ কিলোমিটার এবং জলপথে ১০৫ কিলোমিটার। প্রতি টন কিলোমিটারে সড়ক পথে খরচ ২.৫৮ টাকা, রেলে ১.৪১ টাকা জলপথে তা কমে হয় ১.০৬ টাকা। সামগ্রিক ভাবে জ্বালানি সাশ্রয় হয়। কমে দূষণও। নেই দুর্ঘঘটনার আশঙ্কাও। ওই কর্তার মত, সে কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার ফরাক্কা দিয়ে এলাহাবাদ যাওয়ার জলপথকে আরও সুরক্ষিত করে সে পথে জাহাজ চলাচল বাড়াতে চাইছে। সে কারণেই চালু রাখতে হচ্ছে ড্রেজিং।