নাকাশিপাড়ার শিশু খুনের ঘটনায় পুলিশ রাধাকান্ত বিশ্বাস নামে প্রতিবেশী এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। রবিবার সকালে বর্ধমানের উজিরপুর ঘোষপাড়া এলাকা থেকে সে ধরা পড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ রাধাকান্ত ওই শিশুকে শ্বাসরোধ করে খুন করে। পরে ওই শিশুকে ওই যুবক ধর্ষণ করেছে বলেও সন্দেহ পুলিশের।
জেলা পুলিশের এক কর্তার প্রতিক্রিয়া, ‘‘ভয়ঙ্কর ঘটনা! মারা যাওয়ার পরে ওই শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করেছে রাধাকান্ত। ধৃত ওই যুবককে বর্ধমান থেকে নিয়ে এসে দফায় দফায় জেরা করা হয়েছে। প্রথম দিকে সে কিছু কবুল করতে না চাইলেও পরে জেরার মুখে ভেঙে পড়ে।’’ পুলিশের দাবি, জেরায় ধৃত রাধাকান্ত কবুল করেছে— বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সে তার বাড়ির সামনে একটি নির্মীয়মাণ বাড়িতে বসেছিল। সেই সময় খেলতে খেলতে পাঁচ বছরের ওই শিশু সেখানে চলে যায়। সেই বাড়ির সিঁড়িতে রাধাকান্তকে সে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে। রাধাকান্ত ওই শিশুকে বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করে। কিন্তু শিশুটি জানায় যে, সে এটা সবাইকে বলে দেবে। এরপরেই রাধাকান্ত শিশুটির মুখ ও নাক চেপে ধরে খুন করে। তখনই শিশুটি মারা যায়।
চলছে শিশুর পারলৌকিক কাজ। সুদীপ ভট্টাচার্যের তোলা ছবি।
রাধাকান্তকে জেরা করে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই ঘটনার পরে রাধাকান্ত বাড়িতে ফিরে এসে খাওয়া দাওয়া করে। প্রায় চার ঘণ্টা পরে সে আবার নির্মীয়মাণ বাড়িতে গিয়ে শিশুটির দেহ তুলে নিয়ে যায় পিছনে লেবু বাগানে। সেখানে দিন দুয়েক আগে কিনে রাখা কন্ডোম ব্যবহার করে সে মৃত শিশুকে ধর্ষণ করে। জেলা পুলিশের ওই কর্তার কথায়, ‘‘রাধাকান্ত জেরায় যা কবুল করেছে তা বিরল ঘটনা। সবথেকে বড় কথা শিশুটিকে খুন করে রাধাকান্ত বাড়িতে ফিরে যায়। এতবড় একটা ঘটনার পরও সে স্বাভাবিক আচরণ করে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে। পরে আবার ফিরে এসে সে এমন কাণ্ড করে।
তবে জেলা পুলিশের একাংশ জানাচ্ছে, এখনও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। কী সেই প্রশ্ন? পুলিশ সূত্রে খবর, রাধাকান্ত জেরায় জানিয়েছে যে, সে কন্ডোম ব্যবহার করেছিল। দু’দিন আগে সে তা কিনেও রেখেছিল। কিন্তু বছর কুড়ির যুবক কন্ডোম সঙ্গে রাখত কেন? ২) পাঁচ বছরের মেয়ের হস্তমৈথুন সম্পর্কে কোন জ্ঞান থাকার কথা নয়। তাহলে কেন রাধাকান্ত তাকে ভয় পেল? কেন সে ভাবল যে, শিশুটি বিষয়টি অন্য কাউকে বলে দিতে পারে?
প্রশ্ন উঠছে পুলিশের অন্দরেও। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক বলছেন, ‘‘রাধাকান্ত যদি স্বীকার করে থাকে যে, সে শিশুটিকে খুনের পরে ধর্ষণ করেছিল। তাহলে পুলিশ ওই শিশুর দেহ উদ্ধারের পরে কেন কিছুই বুঝতে পারল না? কেন পুলিশ তেমন কোনও চিহ্ন খুঁজে পেল না? জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘রাধাকান্ত জানিয়েছে সে রক্ত মুছে দিয়েছিল। সেই কারণেই আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না। তাছাড়াও তেমন কোনও স্পষ্ট চিহ্নও আমরা পাইনি। জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হতে পারেননি বলে তাঁরাও দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য কলকাতা পাঠিয়েছিলেন। আমরা নির্দিষ্ট করে ধর্ষণের বিষয়টিই জানতে চেয়েছিলাম।’’
কেন জেলা হাসপাতালে ওই শিশুর ময়নাতদন্ত না করে কলকাতায় পাঠানো হল? শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের সুপার পার্থ দে বলেন, ‘‘ওই শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না ও সেই সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে গেলে দরকার ছিল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের। কিন্তু আমাদের হাসপাতালে ওই বিশেষজ্ঞ না থাকার কারণে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে।’’ সেই রিপোর্ট এখনও পুলিশের হাতে আসেনি বলেই জানা গিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে খেলতে নিখোঁজ হয়ে যায় বছর পাঁচেকের ওই শিশু। সারা রাত গ্রামে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনও সন্ধান মেলেনি। পরের দিন সকালের বাড়ির কাছে একটি লেবুবাগানের ঝোপের ভিতরে শিশুর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন এলাকার মানুষ। তার মুখে, মাথায় রক্ত ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরেও ছিল আঘাতের চিহ্ন। ওই নির্মীয়মাণ বাড়ির সিঁড়িতে যেখানে রক্তের দাগ ছিল সেখানেও ছড়ানো ছিল দেশি কুল আর কন্ডোমের প্যাকেট।
ওই যুবকের বাড়িতে কুলগাছ আছে। সেই কুল গাছতলাতেও শেষ বারের মতো দেখা গিয়েছিল শিশুটিকে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, শুক্রবার সকাল থেকে বাড়ি থেকে পলাতাক ওই ওই যুবক। তারপর থেকে পুলিশ ওই যুবকের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করে। তদন্তের নেমে নানা সূত্র থেকে পুলিশ নিশ্চিত হতে থাকে যে ওই ‘কুলবাড়ি’র যুবক রাধাকান্তই এই খুনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এরপরই পুলিশ ওই যুবকের এক আত্মীয় সাহায্য নিয়ে রবিবার উজিরপুর থেকে রাধাকান্তকে গ্রেফতার করে।
জেলার পলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওই যুবককে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হওয়ার পরেই সমস্ত কিছু পরিষ্কার করে বলা সম্ভব হবে।’’