Advertisement
E-Paper

পার্বণে মান রাখে এক টাকার বুটের নাড়ুই

টাকায় বুটের নাড়ু! তিন টাকায় চায়না লাড্ডু কিংবা মতিচুর লাড্ডু! রশেবশে থাকা দরবেশের প্রতি পিস দু’টাকা! একটু আকারে বড় হলে অবশ্য প্রতি পিসের দাম তিন টাকা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০০:৪১
মিষ্টির দোকানে সাজানো বুটের নাড়ু। —নিজস্ব চিত্র।

মিষ্টির দোকানে সাজানো বুটের নাড়ু। —নিজস্ব চিত্র।

টাকায় বুটের নাড়ু! তিন টাকায় চায়না লাড্ডু কিংবা মতিচুর লাড্ডু! রশেবশে থাকা দরবেশের প্রতি পিস দু’টাকা! একটু আকারে বড় হলে অবশ্য প্রতি পিসের দাম তিন টাকা। জঙ্গলমহলের গ্রামীণ জনপদগুলিতে বিজয়ায় অতিথি আপ্যায়ণের দিনগুলিতে এমন সব চিরাচরিত মিষ্টির চাহিদা বাড়ে। এই মিষ্টি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি হল লালগড়। সেখানকার বুটের নাড়ু, মতিচুর লাড্ডু ও দরবেশের স্বাদ নিতে পুজোর দিনগুলিতে স্থানীয় দোকানগুলিতে ক্রেতাদের রীতিমতো ভিড় জমে যায়। সস্তার মিষ্টিতে দরিদ্র মানুষরা বিজয়া সারেন। আবার কোথাও কোথাও লক্ষ্মীপুজোয় নৈবেদ্যের পাতে স্থানীয় বেসনের নাড়ু-লাড্ডু দেওয়ার চল রয়েছে। লালগড়ের মিষ্টির দোকানগুলিতে যেমন থরে থরে বুটের নাড়ু, মতিচুর লাড্ডু ও দরবেশ সাজানো থাকে। তেমনই এখানকার কালোজাম, ক্ষীরকদম্ব, রসগোল্লা, পান্তুয়া সংস্কৃতিও বেশ প্রাচীন। চিরাচরিত এইসব মিষ্টির টানে আসেন দূরদূরান্তের খদ্দেররাও। তবে সস্তায় নাড়ু-লাড্ডুর কোনও জুড়ি নেই।

ছোলার বেসন থেকে তৈরি হয় বুটের নাড়ু। কোনও কোনও এলাকায় অবশ্য ‘চানার লাড়ু’ নামেও পরিচিত। প্রথমে ঘিয়ে ভেজে নেওয়া হয় বেসনের ঝুরি। তারপর ঘন চিনির রসে অথবা পাতলা গুড়ের রসে সেই ঝুরি মিশিয়ে তৈরি হয় বুটের নাড়ু বা চানার লাড়ু। দেখতে খানিকটা লাড্ডুর মতো। রূপে ও স্বাদে অতুলনীয়! এক সময় বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের জন্য বুটের নাড়ু তৈরির বরাত পেতেন স্থানীয় হালুইকরেরা। লালগড়ের খাসতালুকে রাজ পরিবার ও ব্রাহ্মণদের ভদ্রাসন থাকায় এখানকার মিষ্টি-সংস্কৃতি বেশ পুরনো। উত্‌সবের মরসুমে লালগড়ের মিষ্টির দোকানগুলিতে যেমন থরে থরে বুটের নাড়ু সাজানো থাকে। মিহিদানা দিয়ে তৈরি মতিচুর লাড্ডু কিংবা ঝুরিভাজা রসে চুবিয়ে
রাজকীয় দরবেশ।

এখন মিষ্টি সংস্কৃতিতে নতুন নাম জুড়েছে চায়না লাড্ডুরও। বেসন ও চিনির রস দিয়ে ছাঁচে বানানো হয় ‘চায়না লাড্ডু’। প্রতি পিস তিন টাকা।

Advertisement

অর্ধশতক আগে লালগড়ের প্রবীণ হালুইকর খাঁদু ময়রার দোকানের নাড়ু ও লাড্ডুর রীতিমতো নাম ডাক ছিল। এখন সেই ঐতিহ্যের মিষ্টি তৈরি করছেন খাঁদুবাবুর ছেলে তাপস দে। লালগড় বাজার এলাকায় পুরনো মিষ্টির দোকানে খদ্দের সামলে তাপসবাবু বলেন, “গরিব এলাকা। তাই মিষ্টির প্রতি পিসের দাম দাম তিন টাকা থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে রাখতে হয়। তবে একশো টাকা কিলো দরেও বুটের নাড়ু ও মতিচুর লাড্ডু বিক্রি করি। এক কেজিতে প্রায় ৪০টা নাড়ু ওঠে।” লালগড় বাজারের প্রবীণ মিষ্টি ব্যবসায়ী মুক্তিপদ দে বলেন, “এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে আমন ধানের চাষ মার খেয়েছে। গ্রামাঞ্চলের চাষ-নির্ভর পরিবারগুলি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাই দোকানে সর্বনিম্ন এক টাকা পিস দামেও ছোট্ট বুটের নাড়ু রেখেছি। বিজয়ায় এমন মিষ্টির চলই বেশি।” বেলপাহাড়ির গণ্ডাপালের বাসিন্দা গোরাচাঁদ ভট্টাচার্যের পারিবারিক পেশা যজমানি। তিনি বলেন, “জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্জলে লক্ষ্মীপুজোয় বুটের নাড়ু বা চানার লাড়ু দেওয়া নৈবেদ্যে দেওয়া হয়। এই নাড়ু সংস্কৃতি রসগোল্লার চেয়েও পুরনো।” বেলপাহাড়ি, ভুলাভেদা, ওদলচুয়া, গিধনির মতো প্রত্যন্ত এলাকার দোকানগুলিতেও ছানার মিষ্টির পাশাপাশি, বেসনের তৈরি চানার নাড়ু-লাড্ডুর কদর এখনও কমেনি মূলবাসীদের কাছে। বেলপাহাড়ির ব্যাঙবুটা গ্রামের বাবলু মাহাতো, লালগড়ের খাঁদি চালক-দের বক্তব্য, “এই এলাকার উত্‌সব-পার্বণে বেসনের তৈরি সস্তার দেশি নাড়ু ও লাড্ডু গরিবের মান রাখে।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy