Advertisement
E-Paper

পরীক্ষাই অমিল রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই সহপাঠীরা পার্ট ওয়ানের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছেন। অথচ নিউ ব্যারাকপুর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের ছাত্রীটি আটকে আছেন সেই ফার্স্ট ইয়ারেই!

মধুরিমা দত্ত

শেষ আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৩:২৭

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই সহপাঠীরা পার্ট ওয়ানের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছেন। অথচ নিউ ব্যারাকপুর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের ছাত্রীটি আটকে আছেন সেই ফার্স্ট ইয়ারেই!

কী করবেন? ক্রমশ পিছিয়ে যাওয়া পরীক্ষার নাগালই যে পাচ্ছেন না!

ওঁরই মতো কেরিয়ার গড়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের সাংবাদিকতার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীটি। আবার বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজের থার্ড ইয়ারের মেয়েটির কথা ধরা যাক। তাঁরও অবস্থা তথৈবচ। ফাইনালের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলাকালীন বন্ধুর এসএমএসে জানতে পেরেছিলেন, পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছে। ধাক্কা খেয়ে নতুন করে পরীক্ষায় বসার চাড়ই খুঁজে পাচ্ছেন না অঙ্কের মেধাবী ছাত্রী।

ভুক্তভোগী তিন জনই বারাসত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। পরীক্ষার নির্ঘণ্ট বারবার পাল্টানোটা যেখানে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক-দু’বার নয়, তিন-তিন বার রুটিন দিয়েও পরীক্ষা পিছোনোর নজির গড়া হয়েছে! এমনকী, রেজাল্ট বার করে বদলানোর ঘটনাও সেখানে বিরল নয়।

সব মিলিয়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। পরিণামে পড়ুয়াদের চরম ভোগান্তি। যেমন বারাসত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছরের স্নাতক ও পাসকোর্সে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল জুলাইয়ে। সেই মতো নোটিস জারি হয়। ক’দিন বাদে ঘোষণা হয়, পরীক্ষা হবে অগস্টে। তা-ও হয়নি। আপাতত কথা রয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা শুরু হবে।

তবু পরীক্ষার্থীরা ভরসা পাচ্ছেন না। ‘‘যা ব্যাপার-স্যাপার দেখছি, প্রশ্নপত্র হাতে না-পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারছি না।’’— মন্তব্য ইংরেজি অনার্সের এক ছাত্রের। যাঁর আশঙ্কা, ‘‘সিনিয়রদের মুখে শুনেছি, দেরিতে পরীক্ষা নিয়ে কোনও মতে রেজাল্ট বার করা হয়। তাতে বিস্তর ভুল-ভ্রান্তি থাকে। আমাদের বেলায় কী হবে, কে জানে!’’

ফি বছর পরীক্ষা পিছোনোর সুবাদে তাঁরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের কাছে হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলেও আক্ষেপ করেছেন বারাসতের অনেক ছাত্র-ছাত্রী। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ সেন্টেনারি কলেজের কেমিস্ট্রি সেকেন্ড ইয়ারের এক পড়ুয়ার কথায়, ‘‘এখন রুটিন দিয়ে দিলেও আমরা ধরেই নিই, অন্তত আরও তিন-চার বার তারিখ বদল হবেই।’’ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাও হতাশা লুকোননি। ‘‘প্রতি বছরই হয়। তবে এ বার রেকর্ড হল।’’— বলছেন তিনি।

এবং পড়ুয়াদের পাশাপাশি শিক্ষকমহলেরও একাংশের অভিযোগ, পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কখনওই পাওয়া যায় না। সত্যি কি তা-ই?

বারাসত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দায় চাপিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজগুলোর উপরে। ‘‘অনেক কলেজে ঠিক সময়ে ফর্ম ফিল-আপ হয় না। তাই কলেজের তরফেই আমাদের অনুরোধ করা হয় পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য।’’— বলেন রামানুজবাবু। এর দরুণ পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির প্রসঙ্গ তোলা হলে তাঁর দাবি, পরীক্ষার্থীদের স্বার্থেই পরীক্ষা পিছোনো হয়। ‘‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কলেজে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু ছেলে-মেয়ে পড়েন। তাঁরা অনেক সময় খবর পান না, কখন ফর্ম ফিলাপ হচ্ছে। চেষ্টা করা হয়, ওঁরা যাতে পরীক্ষায় বসতে পারেন।’’— যুক্তি দেন রেজিস্ট্রার।

তাঁর যুক্তিকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কলেজ-শিক্ষকদের একাংশ। যেমন মণিরামপুরের মহাদেবানন্দ মহাবিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলছেন, ‘‘কলেজ থেকে কোনও কালে এমন অনুরোধ যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় নিজে অ্যাকা়ডেমিক ক্যালেন্ডার বানিয়ে নিজেই মানে না!’’ দক্ষিণেশ্বরের হীরালাল মেমোরিয়াল কলেজ ফর উইমেন-এর কর্তৃপক্ষেরও দাবি, পরীক্ষা পিছানোর আর্জি কলেজের তরফে কখনওই করা হয় না।

বস্তুত বিষয়টি নিয়ে বারাসত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সমিতি আগামী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামকের কাছে ডেপুটেশন দেবে বলে জানিয়েছেন এক শিক্ষক।

অর্থাৎ, দায় নিয়ে চাপান-উতোর চলছেই। কিন্তু নিয়ম না-মানার এ হেন ‘রেওয়াজের’ পিছনে আসল কারণটা কী?

সূত্রের ইঙ্গিত, মূল সমস্যা লোকাভাব। কর্মচারী কম থাকায় বাইরের লোক দিয়ে পরীক্ষার কাজ সারতে হচ্ছে। ফলে দায়বদ্ধতায় হামেশাই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। রেজিস্ট্রার নিজেও পরোক্ষে এটা স্বীকার করেছেন। রামানুজবাবুর আক্ষেপ, ‘‘আমাদের পরিকাঠামো অত্যন্ত খারাপ। ছ’বছর কোনও নিয়োগ নেই! নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। এত দিন তো স্থায়ী উপাচার্যও ছিলেন না!’’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পদ থেকে সম্প্রতি বারাসতের নতুন উপাচার্যের পদের দায়িত্বভার নিয়েছেন বাসব চৌধুরী। এ দিন তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘পরীক্ষার ব্যাপারটা এখনও দেখে উঠতে পারিনি। কী সমস্যা হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে দেখছি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy