গোটা গ্রামে শোকের ছায়া। কেউ ভাল করে কথা বলতে পারছেন না। গ্রামেরই পাঁচ শিশু প্রাণ হারিয়েছে বৃহস্পতিবারের পুলকার দুর্ঘটনায়। সেই থেকে কান্নার রোল। পাড়া-পড়শিরাও শোকাহত। শুক্রবার চাকুলিয়া বাজার বন্ধ রেখেছিলেন এলাকার ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যায় মোমবাতি নিয়েও মৌন মিছিলও করে এলাকার পড়ুয়ারা।
মৃত শিশুদের কারও বাবার ওষুধের ব্যবসা রয়েছে। কেউ আবার সরকারি দফতরে চাকরি করেন। বেশির ভাগ শিশুর মায়েরাই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে চাকরি করেন। ভাল স্কুলে ভর্তি করার জন্য গ্রাম ছেড়ে চাকুলিয়া বাজারে বাড়ি করেছিলেন তাদের পরিবারের লোকেরা। বিহারের ওই স্কুলের স্কুল বাস রয়েছে। তবে তা কেবল বিহার এলাকার জন্যই। চাকুলিয়ার পড়ুয়াদের জন্য কোনও বাসের ব্যবস্থা নেই। স্কুলকে বার বার করে বলেও কোন লাভ হয়নি বলে অভিযোগ। কাজেই ছেলেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে অগত্যা নিজেরাই দুটো ছোট গাড়ি ভাড়া করেন অভিভাবকেরা।
দুটি গাড়ির একটিতে ১৪ জন ও অপর একটিতে ১২ জন যাতায়াত করত। অভিভাবকদের দাবি, প্রথমে ঠিকই ছিল। তবে সম্প্রতি গাড়ির চালক বদল করেছিলেন মালিক। সে অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালাত বলে অভিযোগ। চাকুলিয়ার লতিপুরের বাসিন্দা পেশায় ওষুধ ব্যবসায়ী নীলাম্বর দাস বললেন, ‘‘ছেলেকে ভাল স্কুলে পড়াব বলে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে চাকুলিয়া বাজারে বাড়ি করি। আমার এক মাত্র ছেলে। প্রতিদিনই ঋককে গাড়িতে ওঠানোর সময় চালককে বলতাম, আস্তে চালাতে। এই সপ্তাহের মধ্যে ছোট গাড়ি কেনার কথা ছিল। তবে সেই সুযোগ দিল না. নিজের গাড়ি থাকলে অকালে ঋক হারিয়ে যেত না।’’ তবে ওই দুর্ঘটনায় কেবল নীলাম্বরবাবুর পরিবারের ঋকই নয়, তাঁদের আত্মীয় অর্ণব মজুমদারও মারা গিয়েছে। অর্ণবের বাড়ি কালিয়াগঞ্জে। বাবা ও মা চাকরিসূত্রে চাকুলিয়ায় থাকায় তাকে বিহারের ওই স্কুলে ভর্তি করেছিলেন তাঁরা।
শোকে পাথর পরিজনেরা। মৃত ছাত্র সাহি আদনান এর বাবা পেশায় স্কুল শিখক এহেবার আহমেদ বলেন, ‘‘প্রতিদিনই ছেলে আলস্য দেখাতো স্কুল যাওয়ার জন্য। বৃহস্পতিবার নিজে থেকে উঠে স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। আমিও কোনও দিন ওকে তৈরি করিনি। ওর মা করত। ওই দিন আমি উঠে ওর জুতো টেডি বিয়ার দিয়ে পরিস্কার করেছিলাম। তাতে আমার উপর রেগে গিয়েছিল। শেষ কথাটা কানে বাজছে এখনও। মা আসছি, আব্বু আসছি। ওই ডাক আর শুনতে পাব না।’’ অপর এক ছাত্র মুকজাদ হুসেনের বাবা মনিরুজ জামাল বলেন, ‘‘শুক্রবার আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে বলে স্কুল যাবে না বলেছিল। এ দিন স্কুল যাওয়ার সময় মুড়ি-ঘুগনি টিফিনটা তার পছন্দ হয়নি। তবে কেন যে ওর পছন্দ মতো টিফিনটা দিলাম না?’’
আরেক মৃত ছাত্র গোপাল সরকারের মা অণু সরকার বললেন, ‘‘ওই গাড়িটি যখন দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়, সেই সময় গাড়িতে থাকা এক ছাত্রী সুস্থ ছিল। তার পরিচয় পত্র থেকে এক জন বাড়িতে ফোন করেন। পরিবারের প্রত্যেকে যখন ছোটাছুটি করছিল থানায় খবর গেলেও পুলিশ সময় মতো পৌঁছয়নি। বিহার পুলিশের সহযোগিতা পেয়েছি। ওরাই এগিয়ে এসেছিল।’’ তাঁদের প্রশ্ন, চাকুলিয়া থানা থেকে রামপুর মাত্র সাত কিমি হওয়া সত্ত্বেও কেন পুলিশ দেরিতে পৌঁছল? গোপালের খুড়তুতো বোনও আহত অবস্থায় শিলিগুড়ির একটি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন।
শুক্রবার তোলা নিজস্ব চিত্র।