Advertisement
E-Paper

‘রঙ্গে নাচে রণ-মাঝে, কার কামিনী মুক্তকেশী’

দিন কয়েক পরেই আলো আর আতসবাজিতে সেজে যে দেবীর মর্ত্যে আগমন ঘটতে চলেছে, তাঁর সৃষ্টির গোড়ায় কিন্তু রয়েছে এক দাম্পত্য কলহের গল্প। দক্ষ রাজার মেয়ে সতীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শিবের। এই বিয়েতে দক্ষের মত ছিল না। তাই তিনি যখন বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করলেন তাতে মেয়ে-জামাই কেউ-ই নিমন্ত্রণ পেল না।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৫ ০৪:১৯

দিন কয়েক পরেই আলো আর আতসবাজিতে সেজে যে দেবীর মর্ত্যে আগমন ঘটতে চলেছে, তাঁর সৃষ্টির গোড়ায় কিন্তু রয়েছে এক দাম্পত্য কলহের গল্প।

দক্ষ রাজার মেয়ে সতীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শিবের। এই বিয়েতে দক্ষের মত ছিল না। তাই তিনি যখন বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করলেন তাতে মেয়ে-জামাই কেউ-ই নিমন্ত্রণ পেল না। তা সত্ত্বেও সতী সেই যজ্ঞে যাওয়ার গোঁ ধরলে শিব আপত্তি করেন। প্রচণ্ড রেগে সতী তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে আগুন বের করতে করতে ধারণ করেন কালী বা শ্যামা রূপ। সেই ভীষণ রূপ দেখে শিব পালাতে যান। তখন সতী দশমহাবিদ্যার রূপ ধারণ করে দশ দিক থেকে তাঁকে ঘিরে ধরেন। বাধ্য হয়ে শিব তাঁকে বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেন।

দশমহাবিদ্যার প্রথম বিদ্যা কালী। দেবীর এই রূপেরও হরেক রকমফের আছে। সচরাচর পাড়ার মন্দিরে বা পুজোর প্যান্ডেলে যে কালীমূর্তি দেখা যায় তার নাম দক্ষিণাকালী। এই রূপে দেবী দিগম্বরী, চতুর্ভুজা। তাঁর বাম দিকের হাতে খড়্গ ও নরমুন্ড। ডান হাতে বরাভয় মুদ্রা। গায়ের রং বর্ষার মেঘের মতো কালো। গলায় মুণ্ডমালার হার। দুটি শবদেহ তাঁর দু’কানের দুল। কোমরে সার সার কাটা হাত ঝুলছে। তিনি ত্রিনয়নী। লোলজিহ্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শিবের বুকের উপর। দেবীর এই রূপ খুব একটাও পুরনো নয়। ষোড়শ শতাব্দীতে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ নামের এক তন্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত দক্ষিণাকালী মূর্তির প্রচলন করেন। তখনও পর্যন্ত কালীর উপাসনা করা হত তন্ত্রোক্ত যন্ত্রে। কথিত আছে, তিনি দেবীর মূর্তি গড়ার সঙ্কল্প করলে দেবী তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বলেন, সকালে উঠে প্রথম যার মুখ দেখবেন তারই আদলে দেবীমূর্তি গড়তে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে বেরোতেই কৃষ্ণানন্দ দেখতে পান এক ঘুঁটে কুড়ুনি মেয়েকে। গরিব মেয়েটির জামাকাপ়ড় শতচ্ছিন্ন, তায় অবিন্যস্ত। ঘুঁটে দেবে বলে বাম হাতে সবেমাত্র তুলেছে গোবরের তাল— যেন সদ্যছিন্ন নরমুন্ড। এমন আলুথালু অবস্থায় পণ্ডিত মশাইয়ের মুখোমুখি হওয়ায় সেই ঘুঁটে কু়ড়ুনি লজ্জায় জিভ কাটে। সেই মেয়েটির আদলেই কৃষ্ণানন্দ কালীমূর্তি গড়েন। তার নাম হয় দক্ষিণাকালী।

কালীর আর একটি রূপের নাম সিদ্ধকালী। এই রূপ বেশ অখ্যাত। গৃহস্থ বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না। মূলত সিদ্ধিকামী সাধকরাই এই রূপে দেবীর আরাধনা করেন। ইনি দ্বিভুজা। দেবীর ডান হাতের খড়্গের আঘাতে মাথার উপরের চন্দ্রমণ্ডল থেকে অমৃত রসের ধারা বেরিয়ে আসছে। বাম হাতে ধরা একটি কপালপাত্রে তা ধারণ করে তিনি পরমানন্দে পান করছেন। ইনি সালংকারা। বাঁ পা শিবের বুকে এবং ডান পা শিবের উরুর উপর রেখে দাঁড়িয়ে থাকেন।

গুহ্যকালীরও সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপও গৃহস্থের কাছে অপ্রকাশ্য। হাজার ফণার অনন্ত নাগের নীচে নাগাসনে বসে থাকেন দেবী। তিনি লোলজিহ্ব ও দ্বিভুজা। তাঁর গায়ের রঙ ঘন মেঘের মত। গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা, কানে শবদেহের কুণ্ডল। দেবীর কোমরে কাল‌ো কটিবাস। কাঁধে সাপের পৈতে, গলায় সাপের মালা। ‌তাঁর মাথায় জটা আর তার নীচে কপালে একফালি চাঁদ।

দেবী দারুক নামের অসুরকে বধ করেছিলেন শ্রীকালী রূপে। এই রূপটিতে তিনি শিবের মত ত্রিশূল ও সাপ ধারণ করেন। বাম দু’হাতে খড়্গ ও নরমুণ্ড এবং ডান দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা। দিগবসনা হয়ে দাঁড়ান বিবস্ত্র শিবের উপর। ভদ্রকালী রূপে দেবীর গায়ের রঙ অতসী ফুলের মত। মাথায় জটা, কপালে অর্ধচন্দ্র আর গলায় কণ্ঠহার। দীর্ঘ কালো চুল রুক্ষ, আলুথালু। জীর্ণ শরীর। দুচোখে কান্নার জল।

চামুণ্ডা দেবীর গায়ের রঙ নীল পদ্মের মত। পরণে বাঘছাল। হাতে দণ্ড, খড়্গ, ঢাল আর নাগপাশ। দুর্গাপূজায় সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। মহাকালী রূপে আবার দেবীর পাঁচটি মুখ, পনেরোটি চোখ। তাঁর গা ভরা গয়না। আট হাতে ত্রিশূল, ধনুর্বাণ, খড়্গ, ঢাল ও বরাভয় মুদ্রা। কাজলের মত কালো গায়ের রঙ শ্মশানকালী দেবীর। তাঁর দু’ চোখ রক্তপিঙ্গল বর্ণের। আলুথালু চুল। বাঁ-হাতে পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য-কাটা নরমুণ্ড। দিগবসনা দেবীর গায়ে নানা রকম অলঙ্কার।

তা বলে পাড়ার প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গিয়ে আবার ঘাবড়াবেন না যেন। দেবী তাঁর স্বামীকে ভয় দেখাতে অমন হয়েছেন। তাতে আপনার ভয় পাওয়ার আছেটা কী?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy