ভোরের সঙ্গে জেগে ওঠা মেয়ে। নদীর গায়ে যখন সোনার আলো, মেয়ের চোখেও জেগে ওঠে স্বপ্ন।

বাঁকড়ার মনিরা খাতুন। হিঙ্গলগঞ্জের লড়াইয়ের মুখ।সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশের নাম হিঙ্গলগঞ্জ। হলে কী হবে?

বেশ অবহেলিত এক জায়গা এই হিঙ্গলগঞ্জ।

অথচ এই হিঙ্গলগঞ্জের ধানের শিষেও পুলক ছোটে। আকাশ ভরে চষা মাটির গন্ধে। আর সেই ধানের গন্ধ গায়ে মেখে জেগে ওঠে একরত্তি এই মেয়ে। শরীরে নয়। মনেই তাঁর প্রচ্ছন্ন তেজ। নদীর দেশের মেয়ে। কূল ছাপিয়ে মাঝ নদীর ভরা জলে ঝাঁপ দিয়েছে সে।

আরও পড়ুন: মেয়েদের ‘শরীর খারাপ’ নিয়ে কাটবে কবে সঙ্কোচ​

‘‘আমি দেখতে রোগাসোগা। মুখ দেখে অনেকের মনে হতে পারে আমি ভিতু! তা কিন্তু একেবারেই নয়। ছোটবেলা থেকেই ভয় জিনিসটা আমার নেই।’’ সাফ জবাব মনিরার।
সেই নীরব তেজে ভোরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামের মেয়েদের নিশ্চিত ঘুম কেড়ে নেয় মনিরা। নাহ্, নিশ্চিন্তির ঘুম মেয়েদের আরও পেছনে টানবে যে। মনিরা তাঁর নদীর তীর ভাঙতে থাকা জীবন দিয়ে চিনেছে বাস্তবকে। ‘‘ভোর চারটেয় উঠে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের ঘুম থেকে তুলি। তার পর ওদের মাঠে নিয়ে যাই ফুটবল প্র্যাকটিসের জন্য।’’ স্বপ্নের কথা ভেঙে ভেঙে জানায় মনিরা।

হিঙ্গলগঞ্জের মতো প্রান্তিক গ্রাম। যেখানে আজও বাবা-মায়েরা পনেরো পেরলেই মেয়েদের বিয়ের তোড়জোড় শুরু করেন, সেখানে একটি মেয়ের আশীর্বাদের দিন বিয়ে আটকে দেয় মনিরা।

সমাজের বিরুদ্ধে যাওয়ার এই সাহস কেমন করে দেখায় মনিরা? বিরুদ্ধ স্বর শুনতে হয়নি?

‘‘হয়নি আবার? লোকে বলতে শুরু করল, আমি খারাপ। মেয়েদের হাফ প্যান্ট পরাচ্ছি। ছেলেদের খেলায় উস্কানি দিচ্ছি। আমার খারাপ মতলব, মেয়েদের বিয়ে ভাঙছি। অনেক অনেক শুনতে হয়েছে!’’এই কথা উড়িয়ে দিতে পারেন মনিরা। তিনিই পারেন। গ্রামের লোকে তাঁর এই কর্মকাণ্ডের জন্য বাবা-মায়ের কাছে নালিশ জানিয়েছে বহুবার! নিজের হাতে সংসার চালানো মনিরা একটা কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল বাবা-মাকে।‘‘বলেছিলাম, সব কথা শুনব। সংসার দেখবো। কিন্তু খেলা নিয়ে কিছু বললে একটা কথাও শুনব না!’’

মনিরা এই লড়াইয়ের জীবনে জেনেছে, সত্য কঠিন। আর সেই কঠিনকে আলিঙ্গন করে নিয়েই মনিরা তার স্বপ্ন বুনছে আলো-আঁধারিতে।
আঁধার আছে...ছড়িয়ে।

তবুও হিঙ্গলগঞ্জ কলেজের তৃতীয় বর্ষের এই ছাত্র (ছাত্রী নয়)আলোর ঝাঁপি খুলে বসেছে দিগন্তে। সেখানে কেবলই গতি। আর সেই গতির নাম ফুটবল। মেয়েদের ফুটবল টিম তৈরি করেছে মনিরা। মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে সব নিয়মের বাইরে এসে মনিরা আর তার দল অনায়সে হলদে হাফ প্যান্ট আর টি শার্ট পরে বলকে তাড়া করে বেড়ায়। নাহ্, স্বপ্নের পথে কোনও অস্বস্তি মনকে দূষিত করেনি মনিরার। ছেলেদের সঙ্গেও খেলে তারা। ‘‘খেলার আবার ছেলে-মেয়ে হয়?’’প্রশ্ন মনিরার।
ওকে দেখে মনে হয়, দু’বেলা দু’মুঠো জোগাড় করাই যার কাছে মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ, সেই মেয়ে আবার অন্যদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে! কী করে?

 

আরও পড়ুন: মুখে নিয়েও ট্যাবলেট ফেলে দিচ্ছে মেয়েরা!

মনিরার ঘরের ছাদ ছোট। কিন্তু তার জীবনের মাঠ অনেক বড়। সেই মাঠে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে তার জন্যই তো জড়ো হয় এক দল মেয়ে। তারা খেলোয়াড়। তাদের পায়ে ফুটবল। তারা চলতে বেরিয়েছে। আর এই চলার মধ্যেই দিন আনি দিন খাই-এর নির্মম জীবনে তারা খুঁজে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস।

মনিরার সঙ্গে যেমন কথা বললে বোঝা যায় তার বয়সী শহুরে মেয়ে যখন  নিজের নেলপলিশের রং, ব্র্যান্ডেড পোশাক আর দামি বয়ফ্রেন্ড নিয়ে নিজের কেরিয়ার সাজাচ্ছে, মনিরা তখন মাঠের ধুলো গায়ে মেখে আঠারোর আগে তার গ্রামের কোনও মেয়ের যেন বিয়ে না হয়, সেই দীক্ষায় নিজেকে দীক্ষিত করছে। ‘‘মুসলিম মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। আমি এটা বন্ধ করতে চাই।’’ সজোরে বলে মনিরা।

বাল্যবিবাহের খবর পেলেই মনিরা আর তার ফুটবল টিমের দল সেই বিয়ে আটকায় বা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়। ‘‘এ সব কাজ একা করা যায় না। আমরা সবাই মিলে মেয়ের বাবা-মাকে বোঝাই। মেয়েরা কিন্তু কেউ রাজি হয় না বিয়েতে...।’’ সেটা জেনেই মেয়ের পরিবারকে হুমকি দেয় মনিরা,‘বিয়ে বন্ধ না করলে ছেলের বাড়িতে মেয়ে সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে আসব কিন্তু!’ 

নিজের কথাও বলে মনিরা,  ‘‘আমরা পাঁচ বোন। জন্ম থেকে শুনছি পাঁচটা মেয়ে! বিয়ে দিতে হবে! খুব রাগ হত আমার! বাবা-মা তো আমারও বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি বিয়ে করিনি।’’

এই ফুটবল খেলার টিম শুধু ফুটবল খেলে না। এরা একটা শ ক্তি। মাঠেই খবর চলে আসে, কার বাড়িতে পড়া বন্ধ করে বিয়ে হচ্ছে। মনিরার দল পৌঁছে যায় সেখানে।

নিজে বিয়ের কথা ভাবে মনিরা?

‘‘নাহ্, আমি বিয়ে করলে তো সংসারটা ভেসে যাবে! এখনই তো ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছি না। যদি একটা চাকরি পেতাম!’’ আলোর থেকে মুখ ফেরায় মনিরা। মাথা নিচু।

মনিরার এই মনোভাবকেকী বলা যায়? এটা কি‘কেরিয়ার’?

মনিরার ভবিষ্যৎ কী তাহলে? ‘‘আমি চাই, আমার গ্রামে সব মেয়েস্কুলে যাক। যে মেয়েদের ঘরে লেখাপড়ার পয়সা নেই সেই মেয়েদের স্কুল যাতে নিখরচায় পড়ায় তার জন্য তো কনকনগর এসডি ইনস্টিটিউশনের হেডস্যার পুলক রায়চৌধুরীকে আমি অনুরোধ করেছি পয়সা ছাড়া মেয়েদের ভর্তি নিতে। হেডস্যার আমাদের সঙ্গে আছেন।’’ কথাটা বলতে বলতে মনিরা নিজেকে আশ্বস্ত করে।

শুধু গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনা আর ফুটবল খেলা নয়। নিজের পরিবারকে বৃক্ষের মতো ঠান্ডা ছায়ায় জড়িয়ে রেখেছে মনিরা। ‘‘বাবা হার্টের ব্যামোয় আর কোনও কাজ করতে পারেন না। মায়ের এক রোগ। হাঁটা চলাই বন্ধ। ঘরে আরও তিন বোন। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল। আর দাদা তো...,’’নিজের বাড়ির নিকোনো দাওয়ায় বসে কথা বলতে বলতে চুপ করে যায় মনিরা। কী এক কথা! যেন বেরোতে চায় না। মনিরার মা পাশ থেকে বলেন, ‘‘থাক। থাক ও কথা।’’ 
আর মায়ের এই অন্যায় বারণে জেদ চেপে বসে মনিরার, ‘‘আমার দাদা বিয়ের পর থেকে আর আমাদের দেখে না। কথা অবধি বলে না।এখনও সমাজে ছেলে হলে মিষ্টি খাওয়ানো হয়!’’

নিজ গুণেই অসাধারণ হয়ে উঠেছে মনিরা।

আরও পড়ুন: টোটো নিয়ে রাস্তায় শেওড়াফুলির সুচিত্রা​

মনিরার পাশে একে একে ওর তিন বোন এসে দাঁড়ায়। মনিরা বলতে থাকে, ‘‘বাবা আর মায়ের ওষুধের খরচ মাসে পাঁচ হাজার টাকা। বোনেদের পড়াশোনা আছে। যে করেই হোক আমায় চালাতেই হবে।’’

শিক্ষার মধ্যে দিয়েই যে আলো আসবে, খড় বিছানো অন্ধকার ঘরে মনিরা সেটা জেনে গেছে।আর তাই চার ব্যাচ টিউশনি ধরেছে সংসার চালাতে। পাশে পেয়েছে আর এক বোনকে। দুই মেয়ের টিউশনির টাকায় সংসার চলে। কিন্তু ওষুধের খরচ? ‘‘রাত অবধি বিড়ি বাঁধি। তাতে কিছু টাকা পাওয়া যায়।’’জবাব মনিরার।  
চাকরির খোঁজ শুরু করেছে মনিরা। হয়তো চাকরির পরীক্ষার বই তার হাতে পৌঁছয় না। টাকাই বা কই? সে সব বই কেনার? তবুও মনিরা পরীক্ষা দিয়ে চলে।
কিছু দিন আগে মনিরা ট্রেনে করে কলকাতায় এসেছিল। একটি সংগঠনের পুরস্কার অনুষ্ঠানে ‘আয়রন ওম্যান’সম্মান নিতে। বাণী বসু, মমতাশংকরের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মনিরা। নিরুত্তাপ! আবেশহীন। এত অল্প বয়সে কলকাতায় এসে মঞ্চের আলোয় নিজের জীবনকে সম্মানিত হতে দেখেও মনিরা অবিচলিত! মনে হয় না ও কোনও পুরস্কার পেয়েছে! কিছু অর্জন করেছে!

মনিরা কবিতা লেখে। গান গায়। আর বাড়ির ছোট্ট বাগানে পা ছড়িয়ে নিজের পড়া করে। তারও স্বভাবের গভীরেঅসাধারণ কিছু তলিয়ে আছে।
মনিরার পাশে থাকা যায় না। লজ্জা হয়...কিন্তু ওর সঙ্গে থাকতে পারি না? ওর কাজের মধ্যে? নিজের জীবন থেকে একটু সরে যদি এক আলোকবর্তিকা ছুঁতে চাই....

ভিডিয়ো সৌজন্য: পৌলমী চক্রবর্তী ও মুনমুন চক্রবর্তী