E-Paper

অবাধে হত্যা করা হচ্ছিল প্রতিবাদীদের

ইরান সংঘাত চলছে প্রায় ৫০ দিন। এই সাত সপ্তাহে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে পৃথিবীর কূটনৈতিক সমীকরণ। আমেরিকায় থাকেন লক্ষ লক্ষ ইরানি। এই পরিস্থিতিতে কেমন আছেন, কী ভাবছেন তাঁরা? বস্টন থেকে এক ইরানীয় অধ্যাপক দম্পতির সঙ্গে কথা বললেন মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়।

মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৫

—ফাইল চিত্র।

শিরিন এবং জাফর (নিরাপত্তার কারণে আসল নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না) তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে প্রথমে কানাডা থেকে ডক্টরেট করেছিলেন। এখন ম্যাসাচুসেটসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জনেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। আজ সাক্ষাৎকারের প্রথম কিস্তি।

আনন্দবাজার: আপনাদের বড় হওয়ার সময়টা কেমন ছিল?

জাফর: আমরা দু’জনেই যখন বড় হচ্ছি, তখন ইরান ‘সুপ্রিম লিডার’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অত্যন্ত কঠিন ইসলামিক শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছি আমরা। প্রতিপদে ছিল রেভেলিউশনারি গার্ডেরা। এমন অনেক বার হয়েছে যে, বাবা বাড়ি থেকে বস্তাভরে বই নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি রাস্তায় ফেলে আসছেন। শুধু বাবা নন, আরও অনেকেই সেটা করছেন, কারণ ইসলামিক নীতি ছাড়া যে কোনও ‘অপছন্দের’ বই বাড়িতে পাওয়া গেলে জেলে যেতে হতো।

শিরিন: আমি পুরোপুরি হিজাবেই অভ্যস্ত ছিলাম। পোশাক, চলাফেরায় কঠোর নিয়ম অনুসরণ করতে হত। কিন্তু তা নিয়ে কারও মনে তেমন অভিযোগ ছিল না। শুধু জানতাম, উচ্চশিক্ষা আর পছন্দের চাকরির জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে।

আনন্দবাজার: মেয়েদের পড়াশোনা বা চাকরির অবস্থা কেমন ছিল সে সময়ে?

শিরিন: সেটা নিয়ে কোনও সমস্যা ছিল না। মনে হয় ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল না বলেই মানুষের মনে অসন্তোষ কম ছিল।

আনন্দবাজার: আপনারা চলে আসার পরে পরিস্থিতি কি পাল্টে গেল?

জাফর: ঠিক তাই। ধীরে ধীরে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হতে থাকল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি বাড়ল। সাধারণ মানুষ বার বার এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু গণতন্ত্র আনা যায়নি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা খুবই কমে গিয়েছিল। বিদেশ থেকে কোনও পণ্য যেত না, অথচ রেভেলিউশনারি গার্ডদের কাছে সবই ছিল। ২০১৪ সালে যখন দেশে গিয়েছিলাম, দু’-তিনটি ‘হাই প্রোফাইল’ পার্টিতে যাওয়ার সুযোগ হয়। এমন কোনও বিদেশি মদ নেই, যা সেখানে ছিল না। অথচ ইরানে মদ্যপান নিষিদ্ধ! রেভেলিউশনারি গার্ড এবং তাদের ঘনিষ্ঠদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত, তারা যা ইচ্ছে আমদানি করতে পারে। করতও তাই। নিজস্ব ট্যাঙ্কারে তেল ভরে এনে চড়া দামে বাইরে বিক্রি করত। আর সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল।

শিরিন: এখন কিন্তু মেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সমাজমাধ্যম আর ইন্টারনেটের এই যুগে সারা পৃথিবী সবার সামনে। দুর্নীতি সহ্য করতে করতে মেয়েরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতা জানাচ্ছে। তারা মুক্তি চায়। আজকালকার মেয়েরা অনেক বেশি সরব। এই প্রজন্মের জন্য আমি গর্বিত।

আনন্দবাজার: হ্যাঁ আমিনি (ইরানের তরুণী মাহসা আমিনি, পুলিশি অত্যাচারে নিহত) তো সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের স্মারক হয়ে উঠলেন।

শিরিন: আমিনিকে হত্যা করার পর থেকে ইরানে মেয়েরা অনেক প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তারা মুখোমুখি বিরোধিতায় ভয় পায় না। আমি পুরোনো দিনের মানুষ, অভ্যেসবশত শেষবার দেশে গিয়েও হিজাব পরেছি। কিন্তু এখনকার মেয়েরা আর পরে না। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা চায়।

আনন্দবাজার: ডিসেম্বর মাসে যখন প্রবল প্রতিবাদ শুরু হল, আপনাদের কী মনে হয়েছিল?

শিরিন-জাফর: খুব উৎসাহ বোধ করছিলাম। আনন্দ হচ্ছিল। কিন্তু তারপরে শুরু হল প্রতিবাদীদের নির্বিচারে হত্যা। সে যে কী ভয়াবহ অবস্থা। ইরানের সংবাদসংস্থা যা-ই বলুক, আমরা ভিডিয়ো ক্লিপিংস দেখেছি। বস্তাবন্দি দেহের দেওয়াল। প্রতিবাদীদের বেশির ভাগ তো তরুণ। তাদের মা-বাবারা ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই বস্তাগুলোর মধ্যে দিয়ে। আর সমানে ফোন করছিল। কোনও বস্তার ভিতর থেকে যদি সন্তানের ফোন বেজে ওঠে!

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Iran War US-Israel vs Iran Interview

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy