E-Paper

তিস্তা প্রকল্পে ভাবাচ্ছে চিন

বাংলাদেশের নয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল তিস্তা প্রকল্প। তিস্তা নিয়ে যে পরিকল্পনা বাংলাদেশ নিয়েছে, সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ০৮:৩২
রণধীর জায়সওয়াল।

রণধীর জায়সওয়াল। —ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের পরে অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে সরব হতে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রকে। আজ ফের সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সওয়াল এই প্রসঙ্গে একই ভাবে সরব হয়েছেন। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত কাল জানিয়েছেন, সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই ঘোষণাকে বিদেশ মন্ত্রক কী ভাবে দেখছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে রণধীর বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত। সীমান্তের নিরাপত্তা আমাদের সরকারের কাছে অগ্রাধিকার। সে ভাবেই আমরা এগোব।’’

এর পাশাপাশি, ঘরোয়া ভাবে ভারত জানাচ্ছে, চিনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির নিরাপত্তা-স্বার্থের পরিপন্থী। দীর্ঘদিন ধরেই চিনের তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহের বিষয়টি ভারতের কাছে উদ্বেগজনক, কারণ এটি বাস্তবায়িত হলে কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলবে ড্রাগন। নয়াদিল্লি মনে করে, সেটাই আসল উদ্দেশ্য চিনের। আর সেই কারণে চিনের পাশাপাশি ভারতও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরে তিস্তার সংরক্ষণে এবং প্রকৌশলগত সহায়তার ক্ষেত্রে হাত বাড়িয়েছিল। প্রসঙ্গত, হাসিনার সরকার তিস্তা মহাসেচ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভার ভারতকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে সবই কার্যত ভেস্তে যায়।

বাংলাদেশের নয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল তিস্তা প্রকল্প। তিস্তা নিয়ে যে পরিকল্পনা বাংলাদেশ নিয়েছে, সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১০২ কিলোমিটার নদীখাত খনন করে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি, নদীর দু’পাশে ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙন রোধের মতো বেশ কিছু কাজ। চিন যদি এই প্রকল্পে নাক গলায়, তা হলে ভূকৌশলগত ভাবেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল চিনের নিশানার মধ্যে চলে আসবে।

নয়াদিল্লির এক ঘরোয়া সূত্রের বক্তব্য, ঢাকার বরং উচিত বেজিংয়ের ব্যাপারে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলা। ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্রের তিব্বতি নাম) নদীতে চিনের তৈরি বাঁধে ভারত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই তাতে বাংলাদেশেরও ক্ষতি। সে বিষয়টির কড়া ভাবে মোকাবিলা করা উচিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের। নদীটি ভারতে ভাটিতে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের জীবিকার উৎস এবং বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে টিকিয়ে রাখে। ঘটনা হল, এর আগে মেকং নদীতে ১২টি ধাপে চিনের তৈরি বাঁধ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভাটিতে জলের প্রবাহ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্রহ্মপুত্রকে একটি জলবোমায় পরিণত করতে পারে, যেখানে হঠাৎ জল ছেড়ে দেওয়া হলে অসম ও অরুণাচল প্রদেশে বন্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, গঙ্গা অববাহিকার মাত্র সাত শতাংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত। ফলে দেশটি পুরোপুরি উজানের দেশগুলোর সহযোগিতার উপরে নির্ভরশীল। নয়াদিল্লির একাংশ মনে করছে, ঢাকার আগে উচিত ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য চিনের উপরে চাপ বাড়িয়ে তার পরে তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতায় রাজি হওয়া।

সম্প্রতি চিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপারেশন সিঁদুরের সময়ে তারা পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করেছিল। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র চিনের নাম না-করে কড়া ভাবে জানান, “আমরা এই ধরনের সহযোগিতার কথা আগেই জানতাম। পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর একটি নিঁখুত, ক্রমিক নিশানাযুক্ত প্রত্যুত্তর। পাকিস্তানে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মদতপ্রাপ্ত জঙ্গি পরিকাঠামো ধ্বংস করা তার লক্ষ্য ছিল। এখন সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেদের মান-সম্মান বিসর্জন দেবে কি না, সেটা রাষ্ট্রসমূহের সিদ্ধান্ত।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Randhir Jaiswal India-China India-Bangladesh Teesta River Security

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy