Advertisement
২৪ জুলাই ২০২৪
International News

হিলারি না ট্রাম্প, কে জিতলে ভারতের সুবিধা?

জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে আসছেন নতুন প্রসিডেন্ট। হিলারি ক্লিন্টন বা ডোনাল্ড ট্রাম্প— কে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী’ আসনটি পাবেন তা নিয়ে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর চলছে। সামনের সপ্তাহে ফল বেরোবে।

রত্নাঙ্ক ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৬ ১৬:৪৬
Share: Save:

জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে আসছেন নতুন প্রসিডেন্ট। হিলারি ক্লিন্টন বা ডোনাল্ড ট্রাম্প— কে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী’ আসনটি পাবেন তা নিয়ে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর চলছে। সামনের সপ্তাহে ফল বেরোবে। এই ফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে ভারত। কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন তার উপরে অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক কেমন যাবে। দু’জনের ঘোষিত নীতিই বলে দেয় কার থেকে কী সুবিধা বা দুর্ভোগের সামনে পড়তে হবে ভারতকে।

যদি হিলারি জেতেন:

মার্কিন রাজনীতিতে হিলারি পোড়খাওয়া সদস্য। দীর্ঘ আট বছর আমেরিকার ফার্স্ট লেডি ছিলেন। বিল ক্লিন্টনের সঙ্গে থেকে প্রশাসনের আনাচ-কানাচ সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এর পরে মার্কিন সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অচিরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনেটর হয়ে ওঠেন। সেই জনপ্রিয়তায় ভর করে ২০০৮-এ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে নামলেও ওবামার কাছে হেরে যান। পরে ওবামাই অবশ্য হিলারিকে বিদেশ সচিব হিসেবে বেছে নেন। এই পর্বে বিশ্ব জুড়ে কাজ করে হিলারির অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে উঠেছে। সেই হিলারি যদি প্রথম মহিলা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন তবে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের গতিপথ কী হবে? হিলারির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে তার একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে

পারিবারিক ভিসা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা

মার্কিন মুলুকে পরিবারের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ শ্লথ। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিবারের কয়েক জন আমেরিকায় থাকলেও অন্য সদস্যরা দেশেই রয়ে গিয়েছেন। হিলারির প্রতিশ্রুতি এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত করা হবে। শুধু তাই নয়, ভিসার খরচও কমিয়ে দেওয়া এবং ‘ল্যাঙ্গোয়েজ প্রোগ্রাম’-এর সুবিধা আরও অনেকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও হিলারি জানিয়েছেন। আটকে থাকা ভিসার আবেদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। এই অঞ্চলের মধ্যে ভারতও আছে। ফলে ভারতের লাভ হবে।

আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্তদের গ্রিনকার্ডের সুযোগ বৃদ্ধি

ভারত থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যায়। ২০১৪-১৫-এ সংখ্যাটা ছিল ১,৩২,৮৮৮ জন। হিলারির প্রতিশ্রুতি, এর মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এ যাঁরা স্নাতক হবেন বা পিএইচডি করবেন তাঁরা আপনাআপনি স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি বা গ্রিন কার্ড পেয়ে যাবেন। এর ফলে ভারতীয় পড়ুয়াদের সুবিধা হবে। অন্য দিকে অবশ্য ‘ব্রেন ড্রেন’-এর পথ আরও সুগম হবে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সংস্থা খুললে সহজে ভিসা

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ১০০ কোটিরও বেশি মূল্যের ৮৭টি নতুন ব্যবসার মধ্যে ৪৪টি শুরু করেছেন অভিবাসীরা। তাই এই ধরনের নতুন ব্যবসা কেউ শুরু করতে চাইলে ভিসার নিয়ম শিথিল করার কথা বলেছেন হিলারি। সহজেই স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাবেন তাঁরা। তবে এ ক্ষেত্রে আমেরিকা থেকেই বিনিয়োগ জোগার করতে হবে। এর ফলে আমেরিকায় কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী ভারতীয়দের সুবিধা হবে। তবে প্রযুক্তি সংক্রান্ত সংস্থা খুলতে চাইলেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

আউটোসোর্সিং-এ ধাক্কা আসতে পারে

প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন নাগরিক উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মার্কিন অর্থনীতির এই ক্ষেত্রটির দিনকাল ভাল নয়। ২০০০ থেকে ২০১৪-এর মধ্যে এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লক্ষ নাগরিক কাজ হারিয়েছেন। অনেকেই এর জন্য ভারতের মতো দেশে আউটসোর্সিংকে দায়ী করেন। এ নিয়ে হিলারি আর ট্রাম্পের কিন্তু বিশেষ মতভেদ নেই। দু’জনেই এই ক্ষেত্রটিকে চাঙ্গা করতে চান। যে সব সংস্থা এই ধরনের আউটসোর্সিং করছেন, তাঁদের কর ছাড় তুলে দিয়ে উল্টে ‘এক্সিট ট্যাক্স’ চাপিয়ে দিতে চান হিলারি। ফলে মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার’ স্বপ্নপূরণ করা মার্কিন সংস্থার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

এইচ-১বি-ভিসা প্রক্রিয়ার সংস্কার

অভিবাসন প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কারে আগ্রহী হিলারি। যার মূল উদ্দেশ্য মার্কিন মুলুকে বেআইনি ভাবে যাঁরা বাস করছেন তাঁদের আইনি ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। সে ক্ষেত্রে এইচ-১বি ভিসা প্রক্রিয়ারও পরিবর্তন আসতে পারে। ভারতের তথ্যপ্রয়ুক্তি ক্ষেত্র এই এইচ-১বি ভিসা-র উপরে নির্ভরশীল। শুধু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীই নন, সাধারণ অভিবাসীদের আমেরিকায় কাজ করতে আসার জন্যও এইচ-১বি ভিসা ব্যবহার করতে চান হিলারি। এতে মার্কিন সংস্থাগুলির পক্ষে ভারতের মতো দেশ থেকে কর্মী পাওয়ায় সমস্যা হতে পারে। যার উল্টো পিঠ ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা। যদিও হিলারি এই ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না বলে আশ্বাসও দিয়েছেন।

যদি ট্রাম্প জেতেন

ট্রাম্প যখন রিপাবলিকার প্রার্থী হওয়ার জন্য দৌড় শুরু করেছিলেন তখন অনেকেই তা ঠাট্টা বলে ধরেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিকান প্রাইমারিতে বাঘা বাঘা প্রার্থীদের পিছনে ফেলে সেই ট্রাম্পই আজ হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রবল বির্তকের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। বিতর্ক এমনই যে, রিপাবলিকানদের একটি অংশ হিলারিকে ভোট দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। তার পরেও ভোটের গ্রাফ বলছে হাড্ডাহাড্ডি টক্কর। যদি ট্রাম্প জেতেন তা হলে কেমন হতে পারে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক?

এইচ-১বি-ভিসা

ট্রাম্প এইচ-১বি-ভিসার পক্ষে। কিন্তু ব্যাপারটি ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’-এর মতো। কারণ, এই ভিসা নিয়ে যে সব কর্মীরা ভারতের মতো দেশ থেকে কাজ করতে আসবেন তাঁরাও যাতে মার্কিন কর্মীদের মতো মাইনে পান তা নিশ্চিত করতে চান ট্রাম্প। ব্যাপারটি উপর থেকে ভালই। কিন্তু ভারতের মতো দেশ থেকে কম মাইনে দিয়ে কর্মী আনা যায় বলেই তো মার্কিন সংস্থাগুলি সেখান থেকে কর্মী নিয়ে আসতে আগ্রহী। যদি তাঁদের একই মাইনে দিতে হয় তবে খামোখা ভারত থেকে কর্মী আনতে কেন আগ্রহী হবে মার্কিন সংস্থাগুলি? তবে এই ধরনের ভিসা নিয়ে যে দুর্নীতি হয় তা বন্ধ করতে আগ্রহী ট্রাম্প।

পাকিস্তান ও কাশ্মীর

পাকিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের ধারণা যথেষ্ট নেতিবাচক। ভারতের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথাও বলেছেন ট্রাম্প। মোদী সরকারের কাছে এর থেকে মধুর বচন আর কী হতে পারে! সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের মদত দেওয়া নিয়েও ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে অনেকটা সহমত। কাশ্মীর নিয়েও ট্রাম্প ভারতের দিকেই ঝুঁকবেন বলে অনেকের আশা।

চিন নিয়ে ধারণা

আমেরিকা-চিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পাল্লাটি বিপুল ভাবে চিনের দিকে ঝুঁকে আছে। আমেরিকার বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি বরাবারই আলোচনার বিষয়। এই ঘাটতির বড় কারণ চিনের সস্তা শ্রমিক। ট্রাম্পও এই ঘাটতি নিয়ে মুখ খুলেছেন। এই ঘাটতি দূর করতে আমদানির উপরে কর বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এতে সস্তা শ্রমিকের সুবিধা পাবে না চিন। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে এ ধরনের কর বসানো শক্ত। ফলে ট্রাম্পের আমলে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

মেক ইন ইন্ডিয়ার উপরে প্রভাব

এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প আর হিলারির একই সুর। মার্কিন উৎপাদন শিল্পকে চাঙ্গা করতে নানাবিধ প্রস্তাব রয়েছে ট্রাম্পের। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে আমেরিকার বাজারকে লক্ষ রেখে ভারতের উৎপাদন শিল্পের শ্রীবৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ভারতের বিনিয়োগকারীদের সুবিধা

ট্রাম্প বরাবরই বিনিয়োগকারীদের উচ্চ হারের করের বিরোধী। আমেরিকায় কর্পোরেট করের হার এখন প্রায় ৩৯ শতাংশ। ট্রাম্পের মতে এতে বিনিয়োগে উৎসাহ কমে যায়। অর্থনীতিবিদদের একাংশ এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। তাই ট্রাম্প বিনিয়োগকারীদের করের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। আমেরিকায় বিনিয়োগে আগ্রহী ভারতীয়দের কাছে এর থেকে মধুর বচন আর কী হতে পারে!

আরও পড়ুন: আমেরিকার এ বারের ভোট এবং পুঁটিদি

এ কি মার্কিন ভোট, না সারা বিশ্বের!

হিলারিকে ঘিরে নারীমুক্তির নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে আমেরিকা

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

US Election Hillary Clinton Donald Trump India
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE