ইরানে টানা বিক্ষোভের মুখে এ বার কিছুটা সুর নরম করলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্রই তাঁদের উপর কঠোর পদক্ষেপ করা চলবে না। নিরাপত্তাবাহিনীর উদ্দেশে এমনটাই নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছেন এবং কারা অস্ত্র নিয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে অশান্তি পাকাচ্ছেন, তা বুঝে পদক্ষেপ করার জন্য বলেছেন তিনি।
বুধবার তেহরানে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক ছিল। ওই বৈঠকের পরে একটি ভিডিয়োবার্তা প্রকাশ করেন ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদ জাফর গায়েমপনাহ। ওই ভিডিয়োবার্তায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, পেজ়েশকিয়ান নির্দেশ দিয়েছেন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যেন কোনও পদক্ষেপ না করা হয়। তিনি বলেন, “একদল লোক আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি, দা নিয়ে ঘুরছেন। থানায় বা সামরিক ছাউনিতে হামলা করছেন। কারা বিক্ষোভকারী এবং কারা অশান্তি পাকাচ্ছেন, সেই ফারাক আমাদের বুঝতে হবে।”
যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট এই বার্তা দিচ্ছেন, সেই একই দিনে আবার বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেন মহসেনি এজেই। তিনি সকলকে সাবধান করে বলেছেন, “যাঁরা ইরানের শত্রুদের সাহায্য করবে, তাঁদের প্রতি কোনও সহানুভূতি দেখানো হবে না।” অনুমান করা হচ্ছে, দেশের ‘শত্রু’ বলতে তিনি ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। কারণ, এই দুই দেশই ইরানে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। ইরানের প্রধান বিচারপতি বলেছেন, “ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের পরে, যাঁরা অশান্তি ও অস্থিরতা ছাড়তে রাস্তায় নেমেছেন, তাঁদের কোনও ভাবেই রেয়াত করা হবে না।”
গত বছর ইজ়রায়েল-ইরান সংঘর্ষের সময়ে জেরুসালেমের পক্ষ নেয় আমেরিকা। আকাশপথে হামলা চালায় ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে। ওই হামলার সাত মাস পরে এ বার ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ নিয়েও মন্তব্য করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের উপর নিরাপত্তাবাহিনী গুলি চালালে, আমেরিকা এগিয়ে আসবে বিক্ষুব্ধদের পাশে দাঁড়াতে। তার পরে খামেনেইও পাল্টা জানিয়েছেন, ইরান কোনও ভাবেই শত্রুক কাছে মাথা নত করবে না। তবে ধারাবাহিক বিক্ষোভের মুখে এ বার কিছুটা সুর নরম করলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট।
গত দেড় সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে ইরানে। শুরু হয় ২৭ ডিসেম্বর। ওই দিন তেহরানের দোকানিরা প্রথম মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ক্রমে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আঁচ। প্রাথমিক ভাবে দেশের আর্থিক অবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ চললেও ক্রমে তা রূপ নেয় তেহরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলী খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিক্ষোভে।
লোর্ডেগান, কুহদাশত এবং ইসফাহান-সহ একাধিক জায়গা থেকে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তেহরানের রাস্তায় নেমে পড়েন। স্লোগান ওঠে, ‘স্বৈরশাসন নিপাত যাক’। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের সময় ক্ষমতাচ্যুত শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পাহলভির পুত্র রেজ়া পাহলভির সমর্থনেও স্লোগান ওঠে— ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোন’। গত কয়েক দিনে ইরানে বিক্ষোভকারীদের উপর দমনপীড়নও চলেছে। বিক্ষোভ শুরুর পরে প্রথম দশ দিনে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। গ্রেফতার হয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী।