দু’সপ্তাহ আগে ভারত থেকে ঘুরে এলাম। কিন্তু ফিরে এসেছি যেন অন্য এক বাস্তবতায়। এটা আমার শহর বলে মনে হচ্ছে না। আমার বাড়ি এবং ষ্টুডিয়োর সামনে দিয়ে অনবরত চলাচল করছে কালচে কাচে ঢাকা অভিবাসী দফতর (আইস)-এর বিশাল বিশাল ভ্যান। আমার বাড়ির উল্টো দিকেই চাইনিজ় রেস্তরাঁর পার্কিং লটে দেখতে পাই কয়েকটা ভ্যান রাত্রের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে যেন বসে আছে। সকাল থেকে ঘুরতে শুরু করে রাস্তায়। বড় রাস্তার বাসস্টপগুলোর কাছে, কাজ করতে আসা মানুষদের জন্য অপেক্ষা করে। গায়ের রং দেখে ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের’ মনে হলে তাদের তুলে নিয়ে যায়। এই শহরের সঙ্গে আমার গভীর সংযোগ, এখানকার মানুষদের সঙ্গে, বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষদের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আমি। সেই আমি বাইরে গেলে আমার আমেরিকান পাসপোর্ট সঙ্গে নিয়ে বেরোচ্ছি!
ডিস্টোপিয়ায় বসবাস করছি যেন। হ্যাঁ, চরম দুঃসহ, অমানবিক, ভীতিকর এবং নিপীড়নমূলক এক কাল্পনিক সমাজ, যা আর এখন ‘কাল্পনিক’ নেই। যারা আইস অফিসার, তাদের দেখে মনে হয় কিছু দিন আগে ভিডিয়ো গেমসে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ খেলত, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। এই প্রচণ্ড নির্দয়ী ঠান্ডার মধ্যে যেন আমার শহরটা জ্বলছে।
আমার বাড়ির থেকে একটু দূরে পাউডারহর্ন কমিউনিটিতে মেরে ফেলা হল রেনে গুডকে। অ্যালেক্স প্রেটির হত্যার জায়গাও আমার বাড়ির খুব কাছে। তবে ওরা ভেবেছিল খুব সহজে দমন করবে মিনিয়াপোলিসের মানুষদের। সেটা হয়নি। আমরা, এই শহরবাসী, একে অন্যের হাত ধরে এই বিপদের একসঙ্গে মোকাবিলা করছি। আমি ভারতবর্ষ থেকে ফিরে দেখি আমার মেলবক্সে কত চিরকুট— ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ ‘কোনও দরকার হলেই এই নম্বরে আমাদের ফোন করো’ ইত্যাদি। ফেরার দু’-এক দিন পরে প্রথম যে দিন পোষ্যকে হাঁটাতে বাইরে বেড়িয়েছি, একটা ব্লক ঘুরে ডানদিক নিতেই দেখলাম পাশে চলে এসেছেন একটি শ্বেতাঙ্গ দম্পতি। মনে পড়ল, কয়েক মাস আগেই ওঁরা পেনসিলভেনিয়া থেকে এসেছেন, আলাপ হয়েছিল। ওঁরা বললেন, “আমরা তোমার সঙ্গে হাঁটব।” আমার আপত্তি শুনল না। ফেরার পথে আমার দু’টো বাড়ির পরের বয়স্ক মার্থা বলল, “আমিও আসছি দীপঙ্কর।” আর এক দিন স্থানীয় দমকল অফিসের কর্তা আমাকে দেখেই গাড়ির গতি কমিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলতে শুরু করলেন। আমার বাড়ির দিকে প্রতিবেশীদের সজাগ দৃষ্টি পালা করে সমস্তদিন-রাত থাকে।
শুধু আমি না। আমার এক জন খুব কাছের মানুষ ল্যাটিনো গির্জার যাজক। বেআইনি অভিবাসী নন, গ্রিন কার্ড আছে। কিন্তু তিনিও গির্জায় যাতায়াত করতে ভয় পাচ্ছেন। আমি খবরটা চারপাশে ছড়িয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে হাত তুললেন বেশ কয়েক জন মানুষ। ঠিক হল, আমরা ওঁকে পালা করে বাড়ি থেকে গির্জায় পৌঁছে দেব, আবার তুলেও নিয়ে আসব, উনি একা বেরোবেন না। ল্যাটিনো গির্জায় যাঁরা যান, তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ভয়ে বাড়ির বাইরে যেতে পারছেন না। প্রত্যেক দিন গির্জায় জমা পড়ছে খাবার থেকে ডায়পার, সব— যাতে তাঁদের বাড়ি থেকে বেরোতে না হয়। ঠিকই ধরেছেন। গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে এই সব মানুষ আপাতত কর্মক্ষেত্রে যাওয়া বন্ধ রেখেছেন, ছেলেমেয়েদেরও স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।
তবে এই সব মানুষকে বর্মের মতো রক্ষা করছেন যাঁরা, তাঁরাও শ্বেতাঙ্গ। এই ঠান্ডায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে সকাল-বিকেল ক্রমাগত গান গেয়ে, স্লোগান দিয়ে তাঁরা আইসকে মিনিয়াপোলিস থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন। আমার ষ্টুডিয়ো, লোকাল কিছু চার্চের দরজা খোলা। জল খেতে, বাথরুম ব্যবহার করতে, প্রবল ঠান্ডার হাত থেকে কিছু ক্ষণের জন্য বাঁচতে তাঁরা যাচ্ছেন সেখানে। এখানেই লেখা হচ্ছে পোস্টার, ব্যানার। আমার বাড়ির কাছের গ্যাস স্টেশন ও পিৎজ়ার দোকান আইসকে কোনও পরিষেবা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের এ ভাবে রুখে দাঁড়ানোটাই আমার শহর। যত ক্ষণ না আইস সম্পূর্ণ ভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে, তত ক্ষণ এই লড়াই চলতে থাকবে।
(লেখক নাট্যকর্মী, প্যাঞ্জিয়া ওয়র্ল্ড থিয়েটারের পরিচালক)
অনুলিখন: মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)