Advertisement
E-Paper

নিউজ়িল্যান্ডের মসজিদে অন্তত একশো বার গুলি বন্দুকবাজের, শ্বেত সন্ত্রাসে শেষ ৪৯

নিউজ়িল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের নুর আল মসজিদে মুসলিম নিধনের সময়ে হেলমেট লাগানো ক্যামেরায় ১৭ মিনিটের ভিডিয়ো তুলে লাইভ স্ট্রিমিং করল আততায়ী।

সংবাদ সংস্থা

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৯ ০৩:০৫
সন্ত্রস্ত: মসজিদের বাইরে পড়ে দেহ। ছবি: এপি।

সন্ত্রস্ত: মসজিদের বাইরে পড়ে দেহ। ছবি: এপি।

চলো, পার্টি শুরু করে দেওয়া যাক!

মুখের কথাটুকু খসার অপেক্ষা। তার পরেই গুলির শব্দ। দশ, কুড়ি, পঞ্চাশ...অন্তত একশো বার। টর্চের আলোয় দেখা যাচ্ছে ভয়ার্ত মুখ। শোনা যাচ্ছে আর্তনাদ। এ-দিক ও-দিকে লুটিয়ে পড়ছেন অসংখ্য মানুষ।

নিউজ়িল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের নুর আল মসজিদে মুসলিম নিধনের সময়ে হেলমেট লাগানো ক্যামেরায় ১৭ মিনিটের ভিডিয়ো তুলে লাইভ স্ট্রিমিং করল আততায়ী। শুক্রবারের নমাজের সময়ে ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে শ্বেত সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন। গুরুতর জখম ৪৮। জখমদের মধ্যে এক জন ভারতীয়ও রয়েছেন। খোঁজ মিলছে না আরও ন’জন ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতের। গ্রেফতার করা হয়েছে বন্দুকবাজ-সহ চার জনকে। প্রথমে হামলাকারীদের ‘বন্দুকবাজ’ বললেও ঘটনার ঘণ্টাখানেক পরে সাংবাদিক বৈঠকে নিউজ়িল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডের্ন বলেন, ‘‘এটা সন্ত্রাসবাদী হামলা। আমাদের দেশের ইতিহাসে অন্যতম ন্যক্কারজনক দিন এটি।’’

বিদ্বেষ বিষ

ব্রেন্টন ট্যারান্ট

• হামলা কোথায়: ক্রাইস্টচার্চের নুর মসজিদ ও লিনউড মসজিদে
• আক্রান্ত: ৪৯ জন নিহত, গুলি লেগে গুরুতর জখম ৪৮ জন
• আততায়ী: ২৮ বছর বয়সি অস্ট্রেলীয় ব্রেন্টন ট্যারান্ট এবং তার তিন সহযোগী, তাদের মধ্যে এক মহিলাও
• পোশাক: সেনার
• মেশিনগান: অন্তত ছ’টি। তাদের গায়ে অতিদক্ষিণপন্থী শ্বেতাঙ্গ জঙ্গিদের নাম লেখা
• গুলি: অন্তত একশোটি। বেশ কয়েক বার কার্তুজের ম্যাগাজ়িন পাল্টায়
• ম্যানিফেস্টো: হামলার আগে ৭৩ পাতা, সাড়ে ষোলো হাজার শব্দের ইস্তাহার পোস্ট করেছিল টুইটারে
• সরাসরি সম্প্রচার: নুর মসজিদে গুলি চালানোর ১৭ মিনিটের ভিডিয়ো ফেসবুক লাইভে আপলোড করে দেয় সহকারী

কাল, শনিবার ক্রাইস্টচার্চে বাংলাদেশ-নিউজ়িল্যান্ড দলের ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা ছিল। হামলার সময়ে নুর আল মসজিদে প্রার্থনা করতে আসার কথা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের। মসজিদ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ক্রাইস্টচার্চ স্টেডিয়াম। সেখানেই ছিলেন ক্রিকেটাররা। বৃষ্টির জন্য তাঁদের মসজিদে আসতে দেরি হয়ে যায়। মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছে বাস থেকে গুলির শব্দ পেয়ে পত্রপাঠ ফিরে যান তাঁরা। মসজিদে প্রার্থনা করছিলেন তিন বাংলাদেশি। নিহত হয়েছেন তাঁরা। কাল খেলা বাতিল করা হয়েছে।

পুলিশ সরকারি ভাবে কিছু না জানালেও এই ভিডিয়ো থেকেই প্রধান আততায়ীকে চেনা গিয়েছে। ২৮ বছর বয়সি এক শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলীয় যুবক।

নাম ব্রেন্টন ট্যারান্ট। হামলার আগে টুইটারে সে একটি ‘ম্যানিফেস্টো’ পোস্ট করেছিল। সেখানে জানিয়েছিল, ‘শ্বেতাঙ্গরাই সর্বশ্রেষ্ঠ’ এই মতাদর্শে বিশ্বাস করে সে। শ্বেতাঙ্গদের উপর বছরের পর বছর চলা ‘বিদ্বেষমূলক আচরণে’র বদলা নিতেই এই হামলা।

আতঙ্কের সেই ১৭ মিনিটের ভিডিয়ো তত ক্ষণে আক্রান্তের মোবাইলেও। শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চে। ছবি: এপি।

স্থানীয় সময় দুপুর ১:৪০। ফেসবুকে ভিডিয়োর সরাসরি সম্প্রচার শুরু হল। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, গাড়িতে বসে রয়েছে ব্রেন্টন। রক গান শুনছে। কাঁধে মেশিনগান। হ্যাগলি পার্কের সামনে গাড়িটা থামল। নামল ব্রেন্টন। সেনার পোশাক পরা। সমানে কথা বলে চলেছে। কয়েক পা হেঁটে আল নুর মসজিদে ঢুকে পড়ল সে। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তার পরেই গুলির শব্দ। আর্তনাদ আর গুলি। মিনিট দশেক গুলি চালানোর পরে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এল ব্রেন্টন। তা হলে কি তাণ্ডব থামল? না! গজগজ করতে করতে লাগল ব্রেন্টন— ‘‘কী আহাম্মক আমি। এত কম গুলি নিয়ে এসেছি কেন!’’ গাড়িতে ফিরে এল বন্দুকবাজ। আর একটা মেশিনগান নিয়ে ফিরে গেল মসজিদে, আবার মিনিট দুই নাগাড়ে গুলি। যিনি আতঙ্কে চিৎকার করছেন, তাঁকেই তাক করে গুলি করছে ব্রেন্টন। সব চুকে গেলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোলো ঘাতক। রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিলেন এক মহিলা। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালালো। তার পর মহিলার একদম কাছে এসে তাঁর মাথা লক্ষ্য করে আরও দু’বার গুলি। এখানেই শেষ নয়। গাড়িতে উঠে, সজোরে চালিয়ে মহিলাকে পিষে দিয়ে বেরিয়ে গেল সে।

“এই দেশ অনেকেরই জন্মভূমি নয়। তাঁরা এ দেশকে বেছে নিয়েছেন নিরাপত্তার জন্য যেখানে নিজেদের সংস্কৃতি এবং ধর্ম তাঁরা পালন করতে পারেন। অনেকেই ভাবছেন, এ দেশে কী করে এই ঘটনা ঘটল? এ দেশ বিদ্বেষীদের আশ্রয়স্থল নয়, এ দেশ বর্ণবিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় না। সে জন্যই আমরা আজ আক্রান্ত। যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরাই আমরা। তাঁদের আশ্রয় আমরা। যে হামলা চালিয়েছে, সে আমাদের কেউ নয়। হামলা করে এই মূল্যবোধকে টলানো যাবে না। ১৬০টির বেশি ভাষা বলা হয় এখানে। .... যারা এই হামলা চালিয়েছে, তাদের আদর্শের তীব্র নিন্দা করছি। তোমরা আক্রমণের জন্য আমাদের দেশকে বেছে নিয়েছ, কিন্তু আমরা তোমাদের নিন্দা করছি, প্রত্যাখ্যান করছি।”
জেসিন্ডা আর্ডের্ন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

আল নুর মসজিদে যাঁরা প্রার্থনা করছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৪১ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর এক জন মারা যান হাসপাতালে। আল নুর মসজিদের এক প্রত্যক্ষদর্শী হাসপাতাল থেকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল। প্রার্থনা শুরু হওয়ার আগে ঠিক যেমন থাকে। যেন, একটা আলপিন পড়লেও শোনা যাবে। হঠাৎ গুলি চালানোর শব্দ। আর আর্তনাদ। সে কী আতঙ্ক।’’

ভিডিয়োটি শেষ হয়ে যাওয়ার মিনিট পনেরো পরে ছ’কিলোমিটার দূরের লিনউড মসজিদে পৌঁছয় আততায়ী ও তার সাঙ্গপাঙ্গোরা। সেখানে তারা ৭ জনকে হত্যা করে। এই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়েই ব্রেন্টনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এক জন। তত ক্ষণে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছে পুলিশও। গ্রেফতার করা হয়ে ব্রেন্টন ও তার তিন সহকারীকে। ব্রেন্টনের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও বাকিদের বিরুদ্ধে মদত দেওয়ার অভিযোগ দায়ের হয়েছে। আগামিকাল আদালতে তোলা হবে ব্রেন্টনকে।

নিশানায় নিউজ়িল্যান্ড

ওয়াঙ্গানুই কম্পিউটার সেন্টারে আত্মঘাতী হানা

• ১৯৮২ সালের ১৮ নভেম্বর ওয়াঙ্গানুইয়ে কম্পিউটার সেন্টারে বোমা নিয়ে হামলা চালিয়েছিল নীল রর্বাটস নামে এক আত্মঘাতী জঙ্গি। বেশ কয়েকটি সরকারি দফতরের কম্পিউটার সিস্টেম ছিল ওই জায়গায়। নিহত জঙ্গি।

ওয়েলিংটন ট্রেডস হলে হামলা

• ১৯৮৪ সালের ২৭ মার্চ ওয়েলিংটনের ট্রেডস হলের লবিতে একটি বোমা ভর্তি সুটকেস রাখা ছিল। সুটকেসটি সরাতে গিয়ে মৃত্যু হয় ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির। হামলার পিছনে কে, তা এখনও ধোঁয়াশায়।

বিমান অপহরণ

• ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিমান অপহরণ করেন এক উদ্বাস্তু মহিলা। ক্রাইস্টচার্চে অবতরণের পরে মহিলাকে কাবু করে ফেলেন বিমানচালক। ২০১০ সালে ন’বছরের কারাদণ্ড
হয় মহিলার।

শুক্রবার সন্ধেবেলা এমনিতে ভিড়ে ঠাসা থাকে ক্রাইস্টল্যান্ডের পাব-রেস্তরাঁ। আজ রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। ক্রাইস্টচার্চের মেয়র লিয়ান ড্যালজ়িল বলেন, ‘‘বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একটা ঘটনা। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপূর্ণ একটা জায়গায় এ রকম যে কিছু ঘটতে পারে, এখনও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না।’’

হত্যার ভিডিয়ো ও ব্রেন্টনের ম্যানিফেস্টো তাদের সাইট থেকে সরিয়ে দিয়েছে ফেসবুক ও টুইটার। তদন্তের প্রয়োজনে সেই ফাইলগুলো শুধু পুলিশ ও গোয়েন্দাদেরই দেখতে দেওয়া হবে। ম্যানিফেস্টোতে বার বার নরওয়ের শ্বেত সন্ত্রাসবাদী অ্যান্ডের্স বেরিং ব্রেইভিকের উল্লেখ করেছে ব্রেন্টন। লিখেছে, ‘‘তিনিই আমার অনুপ্রেরণা। তাঁর আশীর্বাদেই আমি আজ সফল হবো।’’ ‘শ্বেতাঙ্গ আত্মপরিচয়’কে জাগিয়ে তোলার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও ‘ধন্যবাদ’ দিয়েছেন ব্রেন্টন। যার উল্লেখ করে ট্রাম্পের সমালোচনা করতে শুরু করেছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্প অবশ্য ‘আক্রান্তদের প্রতি সমবেদনা’ জানিয়ে টুইট করেছেন। আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ‘‘৯/১১-র পরে যে ভাবে নির্বিচারে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ করা হয়, আজকের হামলা তার চরম প্রকাশ। আমি আগেও বলেছি, জঙ্গিদের কোনও ধর্ম হয় না। নিউজ়িল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি সেটাই দেখিয়ে দিল।’’

জাতীয় শোক ঘোষণা করে আজ নিউজ়িল্যান্ডে সব সরকারি দফতরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আর্ডের্ন বলেন, ‘‘আক্রান্তদের মধ্যে অনেক অভিবাসী রয়েছেন। অভিবাসীদের উদ্দেশে আমার বার্তা, ‘‘আপনারা এই দেশকে আপন করে নিয়েছেন। এই দেশ আপনাদেরও। আমরা ও আপনারা, দু’জনে এক সঙ্গে এই দেশে রয়েছি। থাকবও। আজ যে হামলা চালালো, এই দেশ তার নয়।’’

New Zealand Attack Shooting New Zealand Terror Terrorism Christchurch Mosques
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy