বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এখন পর্যন্ত প্রার্থীর সংখ্যা ২৫৬৯ জন। সেখানে মহিলা প্রার্থীর সংখ্যামোটে ১০৭! তাঁদের মধ্যে ৭২ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, বাকিরা নির্দল প্রার্থী। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দলের কোনও মহিলা প্রার্থী নেই। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের মতে, যদিও গত নির্বাচনের থেকে এই দফায় মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য বেড়েছে, কিন্তু যেখানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী, সেখানে ভোটে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরিসংখ্যান নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অশনি সঙ্কেত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে এমন একটা দেশে, যেখানে আর আগে দু’জন মহিলা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ১০৮ জন মহিলা প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণে ওই সংখ্যা এখন ১০৭। যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.২৬ শতাংশ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহিলা প্রার্থী ছিলেন ৯৬ জন। সেই হিসেবে এ বার মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে মহিলাদের সংখ্যা এখনও কম। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ বার ৪০ জন মহিলা নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়াই করছেন। যা মোট মহিলা প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। নির্দলের মধ্যে নজরকাড়া মহিলা প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন প্রাক্তন বিএনপি এমপি রুমিন ফারহানা। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রাক্তন এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা লড়ছেন ঢাকা-৯ আসন থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, মহিলা প্রার্থী কম হওয়ার কারণ, মোটেই নারীদের রাজনীতিতে আগ্রহের ঘাটতি নয়। বরং দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
বিএনপি ১৩টি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ১০টি আসনে মহিলা প্রার্থী দিয়েছে। বাকি দলগুলির মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা এক অঙ্কে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলের কোনও মহিলা প্রার্থী নেই। দেশের মহিলা সংগঠনগুলির মতে, এই পরিস্থিতি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। বড় রাজনৈতিক দলগুলি খুব অল্পসংখ্যক মহিলাকে মনোনয়ন দেয়, আর ছোট দলগুলি তাদেরই অনুসরণ করে। সামাজিক মানসিকতার সঙ্গে আর্থিক বাধাও অন্যতম কারণ। অভিনেত্রী-রাজনীতিক রোকেয়া প্রাচীও মনে করেন, ‘‘ইউনূস জমানায় মহিলারা ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছেন। তৌহিদি জনতার মব সংস্কৃতির শিকার হচ্ছেন মহিলারাও। রাষ্ট্রনীতিতে মহিলারা নেই। স্বভাবতই তার প্রভাব পড়ছে নির্বাচনী লড়াইয়ে মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও।’’
ভোটযুদ্ধে মহিলা প্রার্থী কমথাকায় প্রতিবাদে সরব হয়েছে বাংলাদেশের কয়েকটি নারী আন্দোলনের যৌথ মঞ্চ ‘নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’। ওই মঞ্চে থাকা অন্যতম সংগঠন ‘নারীপক্ষ’-এর গীতা দাসের কথায়, ‘‘জুলাই সনদ-এর খসড়া অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা আগের মতো ৫০ থাকবে। তবে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এ হার তা-মানা হল না। এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রকে ব্যাহত করবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)